
ডা. সাঈদ এনাম
ডায়াবেটিসকে অনেকেই শুধু রক্তে শর্করার সমস্যা হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর নীরব ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক ও নীরব ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। মধ্যবয়সী এক রোগীর (ছদ্মনাম: কলিম সাহেব) ঘটনাই এ ধরনের ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভোগা এই রোগী হালকা বাম বক্ষের অস্বস্তিকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করেন। তবে পরবর্তীতে ইসিজি পরীক্ষায় তার হার্ট অ্যাটাক ধরা পড়ে যা ছিল একটি সাইলেন্ট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের হার্ট অ্যাটাকে প্রচলিত তীব্র বুকব্যথা, ঘাম বা বমিভাব নাও থাকতে পারে। ফলে রোগীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা একটি প্রাণঘাতী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস স্নায়ুতন্ত্র ও ক্ষুদ্র রক্তনালির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি তৈরি হয়, যার ফলে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে রক্তনালিতে চর্বি জমে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস তৈরি হয় যা হার্ট ও মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হলেও উপসর্গ অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে। ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির ভারসাম্যহীনতা যুক্ত হলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমন্বিত ঝুঁকি অনেক সময় ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করতে থাকে এবং হঠাৎ করে গুরুতর অবস্থায় প্রকাশ পায়। দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শারীরিক অসুস্থতা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার সীমাবদ্ধতা রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডায়াবেটিস ও ডিপ্রেশন একে অপরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় ছোট ও অস্পষ্ট উপসর্গই বড় বিপদের আগাম সংকেত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস শুধু একটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অবস্থা নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক নীরব ক্ষয়প্রক্রিয়া। সময়মতো নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা না থাকলে এটি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ