ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারী ইউনিয়নের বানার নদীর তীরঘেঁষা কুরচাই ও চাকুয়া গ্রাম একসময় পরিচিত ছিল ‘শীতল পাটির গ্রাম’ নামে। শত বছরের ঐতিহ্য আর হাজারো পরিবারের জীবিকার উৎস ছিল এই কুটিরশিল্প। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার এবং বাজার সংকটের কারণে একসময়কার সমৃদ্ধ এই শিল্প এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে।
একসময় যেখানে এক হাজারেরও বেশি পরিবার শীতল পাটি তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল সেখানে বর্তমানে মাত্র ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
সরেজমিনে চাকুয়া গ্রামে গেলে দেখা যায়, বাড়ির বারান্দায় বসে নারীরা শীতল পাটি বুনছেন। তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে নানা নকশার পাটি। পুরুষ সদস্যরা মুর্তা সংগ্রহ, প্রস্তুত এবং বাজারজাতকরণের কাজে ব্যস্ত। পরিবারের সবাই মিলে যেন ধরে রেখেছেন একটি বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য।
সত্তর বছর বয়সী কারুশিল্পী গোপাল চন্দ্র দে জানান, মুর্তা গাছ সংগ্রহ করে তা শুকিয়ে তিন ভাগে কাটা হয়। এর সবচেয়ে উন্নত অংশ ‘নাল’ দিয়ে তৈরি হয় শীতল পাটি। আগে প্রতিদিন একটি করে পাটি তৈরি ও বিক্রি হতো, কিন্তু বর্তমানে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমে গেছে।
এ অঞ্চলে সাধারণত বেতের পাটি, বোকা পাটি এবং নামাজের পাটি তৈরি করা হয়। আকার ও মানভেদে প্রতিটি পাটি ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। স্থানীয় বাজার ও আশপাশের গ্রামে ফেরি করে এসব পাটি বিক্রি করেন কারিগররা।
চাকুয়া গ্রামের বুলবুলি রানী সরকার শীতল পাটি বুনেই সংসার চালান। পাটির আয়ে তিনি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, প্লাস্টিকের পাটি বাজার দখল করে নিয়েছে। আগের মতো বিক্রি হয় না। পাটি বিক্রি না হলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো পেশা বদলাতে হবে।
একই হতাশার কথা জানান স্বরস্বতী সূত্রধর। সংসারের কাজের ফাঁকে প্রতিদিন পাটি বুনলেও কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না। অনেক পরিশ্রমের পর একটি পাটি তৈরি হলেও তার যথাযথ মূল্য পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ তাঁর।
যমুনা রানী দে বলেন, প্লাস্টিকের পাটির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় পুঁজি নেই, বাজারও সীমিত। ফলে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
শীতল পাটি বুনন শিল্পী সমিতির সভাপতি উজ্জ্বল চন্দ্র দে মনে করেন, সরকারি সহযোগিতা ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
তিনি বলেন, ঋণ সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা গেলে শিল্পটি নতুন সম্ভাবনা পাবে। আমরা চাই আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য হারিয়ে না যাক।
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রচারণার মাধ্যমে শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে।
বানার নদীর তীরের কুরচাই ও চাকুয়া গ্রামে আজও প্রতিদিন তৈরি হয় কিছু শীতল পাটি। প্রতিটি পাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের জীবিকা, সংগ্রাম এবং শত বছরের ঐতিহ্য।
তবে বাজার সম্প্রসারণ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং নতুন উদ্যোগের অভাবে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে একসময় হয়তো ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প।