২০২৫ সালে দেশের ব্যাংক খাত প্রথমবারের মতো সম্মিলিতভাবে লোকসানে পড়েছে। সব ব্যাংকের একত্রিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি, বিপুল প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ, সুদ আয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতি এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ব্যাংকগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করে এই বড় ধরনের লোকসানের চিত্র পাওয়া গেছে। এর আগে কখনো পুরো ব্যাংক খাত একসঙ্গে এভাবে লোকসানে পড়েনি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে অনেক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে ঋণ থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় পরিচালন মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে বছরের শেষে ব্যাংক খাতকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয়ও ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ আমানতের বিপরীতে পরিশোধিত সুদের তুলনায় ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় কম হয়েছে যা খাতটির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের অনিয়ম এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব এখন সরাসরি ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় গত বছর কিছু দুর্বল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা বা ঋণ পুনঃতফসিল যথেষ্ট নয়; বরং সুশাসন নিশ্চিত করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাত দুর্বল হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাবায়ন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে।