দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে একের পর এক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোথাও অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা, আর কর্মহীন সময় পার করছেন হাজার হাজার শ্রমিক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুর, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, বোর্ডবাজার, টঙ্গী ও কালিয়াকৈরসহ শিল্পঘন এলাকাগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সফিপুরের গোমতী টেক্সটাইল কারখানায় গ্যাসের অভাবে টেক্সটাইল, ডাইং ও নিটিং বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক প্রতিদিন কারখানায় এসে শুধু ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কারখানাটির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন জানান, লাইনে গ্যাসের চাপ একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে। প্রথম দিকে বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব না হওয়ায় ১৯ জুলাই থেকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
একই পরিস্থিতি মৌচাকের সাদমা ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডেও। প্রায় সাত হাজার শ্রমিকের এই কারখানায় উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেন, কারখানা সচল রাখতে অন্তত ৪ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ১ পিএসআইয়েরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে।
আমবাগ এলাকার তাপস পিএন কারখানাও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে কোনাবাড়ীর তুসুকা গ্রুপ ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক তারেক হাসান।
শিল্প মালিকদের দাবি, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অধিকাংশ কারখানায় মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। কোথাও কোথাও চাপ একেবারেই শূন্য।
জানা গেছে, গাজীপুর জেলা ও মহানগরে সাড়ে তিন হাজারের বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি অন্তত অর্ধশত কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে।
তবে গ্যাস সংকটে ঠিক কতগুলো কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা উৎপাদন কতটা কমেছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কাছে।
গাজীপুরের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম এম মামুন-অর-রশিদ বলেন, গ্যাস সংকটের বিষয়টি জানা থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি চলছে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্প মালিকদের ওপর নয়, শ্রমিকদের জীবিকা ও আয়-রোজগারের ওপরও পড়ছে।
এদিকে তিতাস গ্যাসের গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. গোলাম ফারুক জানান, গাজীপুর জেলা ও মহানগরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণেই শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছে।