ডলারের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসায় দেশের আমদানি বাণিজ্যে নতুন করে গতি ফিরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে যা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকায় বাজারে ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় আমদানিকারকদের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলা দাঁড়িয়েছে ১২১ কোটি ডলারে যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪.৫৫ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বৃদ্ধি মূলত শিল্প খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করছে, কারণ মূলধনী যন্ত্রপাতি সাধারণত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমে দাঁড়িয়েছে ১১১ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২.৭৫ শতাংশ কম। অর্থাৎ নতুন এলসি খোলার হার বাড়লেও বাস্তব আমদানি কার্যক্রম ও অর্থ ছাড়ের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু চাহিদার ওঠানামা নয় বরং আমদানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগার স্বাভাবিক একটি ধাপও হতে পারে।
অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি উভয়ই কিছুটা কমেছে, যা উৎপাদন খাতে চাপের ইঙ্গিত দেয়। তবে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এলসি খোলা বেড়েছে ফলে বাজারে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতেও এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি উভয়ই কমেছে, যা বৈশ্বিক দামের ওঠানামা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৬.০৩ শতাংশে যা দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা মিলিয়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এলসি খোলার বৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ তৈরি করেছে।
অনেক উদ্যোক্তা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন আবার গতি পেতে পারে। বিশেষ করে শিল্প খাতে নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পূর্বাভাস দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা গেলে ধীরে ধীরে অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।
সব মিলিয়ে, ডলারের বাজারে স্বস্তি এলসি খোলার মাধ্যমে বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে নিষ্পত্তি কমে যাওয়া ও সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বল চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে অর্থনীতির পূর্ণ গতি ফিরতে এখনো সময় প্রয়োজন।