প্রায় পাঁচ দশকের শত্রুতা, অবিশ্বাস এবং সংঘাতের পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে একটি সমঝোতার পথে এগিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
কয়েক মাসের সামরিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতি ও ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি কাঠামোতে সম্মত হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কাতার। পাশাপাশি পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও নেপথ্যে সক্রিয় ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ তৈরি করা।
আলোচনার সূত্রপাত ঘটে কয়েক দফা সংঘর্ষের পর। উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও মধ্যস্থতাকারীরা একাধিকবার তেহরান, দোহা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যাতায়াত করে সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করেন। প্রস্তাবিত চুক্তির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনার পথ খুলে দেওয়া।
তবে পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে নানা বাধা সামনে আসে। আলোচনার মাঝেই একাধিক সামরিক হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং রাজনৈতিক চাপ সমঝোতাকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলে।
কখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি, কখনো ইরানের অনাস্থা, আবার কখনো ইসরায়েলের পদক্ষেপ আলোচনার গতি ব্যাহত করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট দূর করা। ইরান মনে করছিল যে আলোচনার আড়ালে আবারও হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ফল চাইলেও তেহরান ধীর ও সতর্ক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ দর-কষাকষির পর ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে আলোচনায় নমনীয়তা দেখাতে সম্মত হয়।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেয়। পাশাপাশি যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়েও দুই পক্ষ নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নতুন অধ্যায় সূচনা করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদিও আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এখনও কিছু বিষয় চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে তবুও দীর্ঘ ৪৭ বছরের বৈরিতার পর এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যেকোনো সময় নতুন সংকট বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য এই সমঝোতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষের আন্তরিকতা ও ধারাবাহিক সংলাপ অব্যাহত রাখা জরুরি।