সরকার নির্ধারিত নতুন বাসভাড়া কার্যকর হলেও রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় দূরপাল্লার বাস পরিবহনে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা। ফলে বিভিন্ন বাস কোম্পানি নিজেদের হিসাব অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করছে। একই রুটে ভিন্ন ভাড়া নেওয়ায় যাত্রীরা পড়ছেন চরম বিপাকে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারে বাসভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা গত বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এতে দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে নতুন ভাড়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, কাউন্টারগুলোতে নতুন ভাড়া নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। কোথাও আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিছু কাউন্টারে আগের ভাড়াতেই টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।
কাউন্টারকর্মীরা জানিয়েছেন, রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা হাতে না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভাড়া এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। তাদের ধারণা, রোববার থেকে নতুন ভাড়া সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হতে পারে।
একই রুটে কোম্পানিভেদে ভাড়া আলাদা হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে। সায়েদাবাদে বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার ঘুরে দেখা যায়, হানিফ পরিবহন, ইউনিক পরিবহন ও শ্যামলী পরিবহনসহ বিভিন্ন কোম্পানি একই রুটে আলাদা ভাড়া নিচ্ছে।
হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মোতালেব হোসেন বলেন, এখনো ভাড়ার তালিকা হাতে আসেনি। কোম্পানির সফটওয়্যার আপডেট করা হয়েছে, যেখানে বেশির ভাগ রুটে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি ভাড়া দেখাচ্ছে। তাই আপাতত সেই হিসাবেই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন গোল্ডেন লাইন পরিবহনের কাউন্টার দায়িত্বে থাকা আমজাদ হোসেন। তিনি জানান, তালিকা না থাকায় সব রুটে ভাড়া সমন্বয় করা যায়নি। কিছু রুটে ভাড়া সমন্বয় হওয়ায় সেগুলোতেই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকেও একই চিত্র দেখা গেছে। জামালপুর, টাঙ্গাইল ও শেরপুরগামী বাসগুলোতে কাউন্টার থেকেই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা–জামালপুর রুটে আগে যেখানে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন সেখানে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
ভাড়ার এই অস্থিরতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রী রহিমা বলেন, একেক কাউন্টারে একেক ভাড়া চাচ্ছে। কোনটা সঠিক বুঝতে পারছি না। কোনো ভাড়ার চার্ট নেই, দরদাম করেই টিকিট নিতে হচ্ছে।
এদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা এসি বাসের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে নির্ধারিত ভাড়া না থাকায় কিছু পরিবহন কোম্পানি নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়েছে। ঢাকা–রাজশাহী রুটে দেশ ট্রাভেলস–এর ভাড়া ১১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০০ টাকা। একইভাবে ঢাকা–কুষ্টিয়া রুটে এসবি পরিবহনের ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে কিছু কোম্পানি এখনো আগের ভাড়াতেই টিকিট বিক্রি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রুটভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করা উচিত ছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, তালিকা প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় অনেক পরিবহন কোম্পানি সুযোগ নিয়ে নিজেদের মতো ভাড়া নির্ধারণ করছে যা যাত্রীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে।
এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর জানিয়েছেন, রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই তা প্রকাশ করা হবে।
এদিকে রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, কমলাপুর, মগবাজার ও মহাখালী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সিটি বাসে এখনো নতুন ভাড়ার তালিকা টাঙানো হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণের পর ২৩ এপ্রিল বাসভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তবে রুটভিত্তিক তালিকা প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রী ও পরিবহন খাতে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা।