মানিকগঞ্জ জেলা শহরের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে আনা, লাইসেন্সের মেয়াদ ছাড়া বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠান চালানো এবং শয্যা জালিয়াতি করে বাণিজ্য করার মতো ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানে।
মানিকগঞ্জ শহরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নজর দিলে দেখা যায়, বিশেষ করে 'অ্যাপোলো হাসপাতাল' এর লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও এটি অবৈধভাবে চলমান। হাসপাতালটিতে নেই কোনো স্থায়ী সোনোলজিস্ট বা রেডিওলজিস্ট, এমনকি অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং এক্স-রে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এছাড়া ১০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও এখানে ১৭ শয্যা পরিচালনা করা হচ্ছে যা স্বাভাবিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে 'মানিকগঞ্জ অর্থোপেডিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল'-এরও ২০২৩ সালে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে অথচ হাসপাতালটি এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে, মানিকগঞ্জ শিশু এন্ড জেনারেল হাসপাতালে যেখানে লাইসেন্স ২০২৩ সালের জুনে শেষ হয়ে যাওয়ার পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন অনুমোদন দেয়নি। তবে হাসপাতালের পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে, এবং অনুমোদিত ২০ শয্যার বদলে সেখানে ৮০ শয্যা পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, হাসপাতালের স্টোর রুম এবং নামাজের ঘরেও রোগী রাখা হচ্ছে।
এছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় নার্স স্টেশন না থাকলেও কেবিন বানিয়ে রোগী রাখা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে এসব অনিয়মের কথা প্রকাশ হওয়ার পর হাসপাতালের দুই পরিচালক পালিয়ে যান এবং ম্যানেজার কাইয়ুম আলী ফাহাদ সাংবাদিকদের প্রতিবেদন সংগ্রহে বাধা দেন।
হাসপাতালের প্রশাসনিক পরিচালক মো. জিয়াউল হক জুয়েল সাংবাদিকদের সাথে উদ্ধত আচরণ করেন এবং ২০ শয্যার জায়গায় ৮০ শয্যা চালানোর বিষয়টিকে ‘মানবসেবা’ বলে দাবি করেন তবে শয্যা জালিয়াতি ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অন্যদিকে হাসপাতালের আরেক পরিচালক মো. সেলিম মিয়া মুঠোফোনে লাইসেন্স না থাকা ও ২০ শয্যার অনুমোদনের সত্যতা স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মুফাখখারুল ইসলাম বলেন, এখানে বেশ কিছু অপরিকল্পিত হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। লাইসেন্স না থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত শয্যা পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে এই ধরনের অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষ। প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে সুষ্ঠু পরিচালনা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।