দিন বা রাত সবসময় আলোয় ঝলমল করে রাজশাহী শহর। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত সবখানেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক বহুতল ভবন। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এই নগর এখন উচ্চতার দৌড়ে এগিয়ে। কিন্তু সেই উচ্চতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে এক নীরব আতঙ্ক আগুন লাগলে কতটা প্রস্তুত এই শহর?
এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর যেন মিলছে ফায়ার সার্ভিসের একটি অত্যাধুনিক গাড়িকে ঘিরে। প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আনা টার্ন টেবিল লেডার (টিটিএল) গাড়ি যা ২০-২২ তলা পর্যন্ত আগুন নেভাতে সক্ষম সেটিই এখন সড়কে নামতে পারছে না। ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার, ডিশ ও ইন্টারনেট লাইনের জট আর নিচু গাছের ডাল যেন থামিয়ে দিয়েছে এই জরুরি সেবার চাকা।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, জরুরি ফোন পেলেই তারা দ্রুত প্রস্তুতি নেন। কিন্তু রাস্তায় নামার পরই একের পর এক বাধার মুখে পড়তে হয়। কোথাও নিচু তার, কোথাও জটলা পাকানো ক্যাবল সব মিলিয়ে গাড়িটি এগিয়ে নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
সাহেব বাজারের ব্যবসায়ী মো.আব্দুল মালেক বলেন, আমার দোকানের ওপর দিয়ে এত তার গেছে যে আকাশটাই দেখা যায় না। রাস্তাগুলো অনেক জায়গায় সরু, বড় গাড়ি ঢুকতেই পারে না। আগুন লাগলে আগুন নেভাতে খুব কঠিন হয়ে পড়বে। আগুন লাগলে দমকল ঢুকবে কীভাবে এই চিন্তা সবসময় থাকে।
[caption id="attachment_3479" align="aligncenter" width="380"]
ছবি: সংগৃহীত[/caption]
শিক্ষার্থী হাসান আলী বলেন, শহর উন্নত হচ্ছে কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে সেইভাবে ভাবা হচ্ছে না। আমি যে ম্যাচে থাকি সেটি একটি দশতলা বিল্ডিং তবে সেখানের রাস্তা অনেক শুরু। সেখানে আগুনের দুর্ঘটনা ঘটলে। ফায়ার সার্ভিসটি ঢুকবে সেই সুযোগ নেই। এই সমস্যাটা দ্রুত সমাধান করা দরকার।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের যে গাড়িটি রয়েছে সেটি ২২ তলা পর্যন্ত আগুন নেভানো যায়, সেটি আমরা পেয়ে খুব খুশি। রাস্তায় যে তারগুলো আছে বিচ্ছিন্নভাবে এগুলা একটা ক্লিয়ারেন্স দরকার আমাদের গাড়ি চলাচলের জন্য। তারপরে বলব যে আমরা যখন কোন ঘটনা ঘটে আমরা দ্রুত যাওয়ার জন্য চেষ্টা করি এবং সেই যখনই কোন বাধাগ্রস্ত হই সেখান থেকে আমাদের আর সামনে আগানোর কষ্ট হয়ে যায়। আমরা সিটি কর্পোরেশন ও ডিসিকে চিঠি পাঠিয়েছি যেন তারগুলো অপসারণ করে। তারের ফলে আমাদের কাজ করতে খুব কষ্ট হয়ে যায়।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মুহাইমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের যেখানে ফায়ার সার্ভিস অফিসগুলো আছে সে আশপাশে রাস্তাগুলো খুবই ছোট যার ফলে তারা কাজ করতে পারে না। আমাদের রাস্তার পাশে কারেন্ট লাইন, ডিস লাইন, ওয়াইফাই লাইনের তার বিভিন্নভাবে ঝুলানো আছে আমরা এটা একটা প্লানিং এর মাধ্যমে নিয়ে আসতে পারি। মাটির নিচ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলে হয়তো আমরা তারের সমস্যা থেকে রক্ষা পাব।
তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের তার মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয় যা আমাদের দেশেও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, তারা যে চাহিদা বলেছে সেটা সঠিক। কোন একটা জায়গায় ফায়ার হয়ে গেলে সেখানে তারা যদি যেতে না পারে তাহলে তো তারা সঠিকভাবে সমাধান করতে পারবে না। আমি চেষ্টা করব খুব দ্রুত সময় যাদের এ লাইনে তার রয়েছে তাদের সাথে বসে অপরিকল্পিতভাবে যে তার ঝুলে আছে সেটা কিভাবে পরিকল্পনায় আনা যায় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ডিস ও ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের ডেকে সমন্বিতভাবে একটি সমাধানে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সড়ক পরিষ্কার করলেই হবে না। বহুতল ভবনগুলোতেও নিজস্ব অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানো কঠিন হবে।