
-ফরিদা ইয়াসমিন
(আমরা সবাই জানি, তবু একটু মনে করি) বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। প্রতিবছর বাংলা সনের প্রথম দিন—১লা বৈশাখ—এই উৎসব উদ্যাপিত হয়। এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে মনে করা হয় যে সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন। তাঁর শাসনামলে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো হিজরি (চন্দ্র) সনের ভিত্তিতে। কিন্তু চন্দ্র সনের সঙ্গে কৃষিকাজের সময়সূচির মিল না থাকায় খাজনা আদায়ে সমস্যা সৃষ্টি হতো।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সৌরভিত্তিক একটি নতুন সন প্রবর্তন করেন, যা পরিচিত হয় ফসলি সন নামে। পরবর্তীতে এটি “বাংলা সন” বা “বঙ্গাব্দ” নামে পরিচিতি লাভ করে। গবেষকদের মতে, ফতেহউল্লাহ শিরাজি সম্রাটের নির্দেশে হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয়ে এক নতুন বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন।
শুরুতে বাংলা নববর্ষ মূলত ছিল খাজনা আদায়ের দিন। জমিদাররা এই দিনে প্রজাদের কাছ থেকে বকেয়া খাজনা আদায় করতেন এবং মিষ্টান্ন বিতরণ করতেন। এভাবেই শুরু হয় হালখাতা প্রথা—ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কেবল প্রশাসনিক দিন নয়, বরং একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। গ্রামবাংলায় বৈশাখী মেলা, নাগরদোলা, পান্তা-ইলিশ, লোকসংগীত ইত্যাদির মাধ্যমে নববর্ষ উদ্যাপিত হতো।
বর্তমানে বাংলাদেশ-এ বাংলা নববর্ষ একটি জাতীয় উৎসব। রাজধানী ঢাকা-তে বিশেষভাবে উদ্যাপিত হয়। ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে রমনা বটমূল-এ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে।
বাংলা নববর্ষ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ এই দিনটি আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে উদ্যাপন করে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলা নববর্ষ আজ একটি অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
লেখক: (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা, সহযোগী অধ্যাপক)
সহকারি পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ