নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম চললেও কৃষকের মুখে এখনো স্বস্তি নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার মধ্যে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে ওজন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ। কৃষকদের দাবি, প্রচলিত ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪৩ থেকে ৪৫ কেজিতে এক মণ ধান ধরা হচ্ছে। ফলে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলমাকান্দা, মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার বিভিন্ন হাওরে কয়েক দফা অতিবৃষ্টিতে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির আধা পাকা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বেড়ে যাওয়া উৎপাদন খরচ।
কৃষকরা জানান, মাঠে ধান কাটার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে গেলে ওজনের কারচুপির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি মণে ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত ধান নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মদন উপজেলার কৃষকরা বলেন, বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এখন ওজনেও ঠকতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
খালিয়াজুরির কৃষক রবিউল বলেন, রাস্তা খারাপ ও সরকারি ক্রয় কার্যক্রম না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। তার ওপর ওজনেও ক্ষতি হচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয় ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, ভেজা ধান কেনার কারণে ওজনে কিছুটা বেশি ধরা হয়। তাদের মতে, মিল পর্যায়ে বিক্রির সময়ও একইভাবে হিসাব করতে হয় তাই কৃষকদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত ওজন নেওয়া হচ্ছে।
তবে কৃষকরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট, যার মাধ্যমে তাদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের ফসলই জেলার অর্থনীতির মূল ভরসা।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানিয়েছেন, সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজারে ভারসাম্য ফিরতে পারে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে ওজন নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে হাওরের সোনালি ফসল ঘরে উঠলেও কৃষকের হাসি এখনো অনিশ্চয়তায় ঢাকা। ন্যায্য মূল্য ও সঠিক ওজন নিশ্চিত না হলে তাদের ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।