রাজশাহী মহানগরীর বড়বনগ্রাম ও নওদাপাড়া এলাকায় প্রায় তিন যুগ ধরে বসবাসরত হাজারো পরিবার হঠাৎ উচ্ছেদের মুখে পড়েছে। এতে পাঁচটি মহল্লার পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভূমিহীন রমজান আলী, পেশায় রিকশাচালক, প্রায় ৩০ বছর আগে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ হিসেবে পরিচিত জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। তিনি জানান, গত রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে হঠাৎ কোনো পূর্ণবাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এতদিন তারা জানতেন না যে জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। দীর্ঘদিন ধরে তারা অর্পিত সম্পত্তি ভেবে বসবাস করছিলেন। তবে হঠাৎ আদালতের নির্দেশনার কথা বলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। অনেকের দাবি, কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের রায়পাড়া, বড়বনগ্রাম, চকপাড়া, ভাড়ালিপাড়া ও পাবনাপাড়া মহল্লায় এসব পরিবার বসবাস করে আসছিল। এর মধ্যে বড়বনগ্রামে ৮টি, চকপাড়ায় ২৫টি এবং অন্যান্য এলাকায় শতাধিক পরিবার রয়েছে। রোববার বড়বনগ্রামের খানকা শরীফ মোড় এলাকায় ১৮ কাঠা জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে একাধিক ঘরবাড়ি ভাঙা হয়। একই দিন পাবনাপাড়ায়ও কয়েকটি বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রয়াত আবুল হাসেম ও মাইনুল হকের ওয়ারিশরা জমির মালিকানা দাবি করে আদালতের রায় অনুযায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তারা অ্যাডভোকেট কমিশনার ও পুলিশ নিয়ে অভিযান চালান। তবে এলাকাবাসীর দাবি, মামলায় তাদের বিবাদী করা হলেও তারা আগে কোনো নোটিশ পাননি।
জমির দাবিদার আজমল হক সাচ্চু জানান, ওই এলাকায় তাদের মোট ৭৬ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু অংশ এখনো দখলে থাকলেও বাকি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দখল ও অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৭ বিঘা জমি উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে এবং অবৈধ দখলে থাকা প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে উচ্ছেদ মামলা করা হয়েছে।
উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় অ্যাডভোকেট কমিশনার নাসির আহমেদ হামলায় আহত হন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উচ্ছেদের পর অনেক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ পাশের আমবাগান ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। বড়বনগ্রামের আমিনা বেগম বলেন, রান্না শেষ করার আগেই ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন কোথায় যাব জানি না।
পাবনাপাড়ার বাসিন্দা মিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দিনে ২০০ টাকা আয় করি, সেই টাকায় সংসার চালাই। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা অমানবিক। প্রয়োজনে জীবন দেব, তবুও জমি ছাড়ব না।
স্থানীয় বাসিন্দা সজিব বলেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া এতগুলো পরিবারকে উচ্ছেদ করা অমানবিক। তিনি বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন জানান, উচ্ছেদ অভিযানে জেলা প্রশাসনের সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিস্তারিত তথ্যও তাদের কাছে নেই। আদালতের নির্দেশনাও এখনো অফিসে পৌঁছায়নি বলে তিনি জানান।