দেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ব্যবস্থা, যা এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপ হিসেবে সামনে এসেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, চুক্তি অনুযায়ী তাদের নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়, আর এই অর্থই ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত। ফলে অনেক কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও সরকারকে অর্থ দিতে হচ্ছে, যা ক্রমেই ব্যয়ের বোঝা বাড়াচ্ছে।
গত দেড় দশকে এই খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং প্রায় ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। ২০১১–১২ অর্থবছরে যেখানে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা, ২০১২–১৩ সালে তা বেড়ে ২ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়ায়। এরপর বিভিন্ন ওঠানামার মধ্য দিয়ে ২০১৯–২০ সালে এটি ২ টাকা ৮৫ পয়সা, ২০২২–২৩ সালে ৩ টাকা ৫৫ পয়সা, ২০২৩–২৪ সালে ৪ টাকা ৬৯ পয়সা এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৫ টাকা ২৪ পয়সায় পৌঁছে যায়। ভবিষ্যতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা পর্যন্ত যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধানও এই ব্যয়ের পেছনে একটি বড় কারণ। দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা সাধারণত ১৮ হাজার মেগাওয়াটের নিচে এবং গড় উৎপাদন প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা অনেক কেন্দ্রকে অলস অবস্থায় রেখেও ব্যয় বহন করতে বাধ্য করছে সরকারকে।
বর্তমানে দেশে ৭৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। পাশাপাশি সরকারি কেন্দ্র রয়েছে ৫৫টি, যেগুলোর সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের বাইরে ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও করা হচ্ছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে উৎপাদন না হলেও চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়, যা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ব্যয়কে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত প্রায় ১৪ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রেন্টাল কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ এক লাখ চার হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে এই খরচ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা এই ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, এটি কার্যত একটি অকার্যকর ও ব্যয়বহুল কাঠামো, যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তারা বলছেন, এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা, অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্র বন্ধ এবং নীতিগত সংস্কার ছাড়া এই খাতে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও তার বিপরীতে ক্যাপাসিটি চার্জের আর্থিক বোঝা দিন দিন ভারী হচ্ছে, যা এখন দেশের বিদ্যুৎ খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।