ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার। মূলত জিএসপি (জেনারেল সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার উপভোগ করে এসেছে।
কিন্তু ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধা আর থাকবে না। ঠিক এই সময়ে ভারতের সাথে ইইউ-এর নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা এই চুক্তি ‘মাদার অব অল ডিলস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এতে ভারত ও ইইউ উভয়ই প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার করবে।
ভারতের তৈরি পোশাক, চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের রপ্তানি বাড়বে।
ইউরোপ থেকে ভারত আমদানিকৃত গাড়ি, ওয়াইন এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম কমবে।
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারত ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে বড় অংশ দখলের সুযোগ পাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে, যেখানে ভারত শুল্ক দিয়ে রপ্তানি করত। চুক্তির ফলে ভারতকে আর শুল্ক দিতে হবে না। ভারতের প্রচুর তুলার মজুদ ও শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজের কারণে তারা বড় পরিমাণে তৈরি পোশাক সরবরাহ করতে পারবে।
ইউরোপের বড় ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য ভারতের দিকে ঝুঁকছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক ক্রেতা এইচঅ্যান্ডএম ইতোমধ্যে তাদের অর্ডার বাংলাদেশ থেকে ভারতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে।
বিজিএমইএ সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীও উল্লেখ করেছেন, কিছু ক্রেতা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে বের হচ্ছে। যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে আরও বেশি অর্ডার চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চে ইইউতে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের রপ্তানি ১৪ বিলিয়ন ডলার যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪৯ শতাংশ।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৮.৩১ ও ১৯.৪১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে, যেখানে ভারতের রপ্তানি ছিল যথাক্রমে ৪.১৮ ও ৪.৫২ বিলিয়ন ডলার।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বাংলাদেশের বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও মানসম্পন্ন পোশাক উৎপাদনের কারণে ভারত এখনও বড় ভলিউমে অর্ডার নিতে পারবে না। তবে সতর্কতা জরুরি।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। ইউরোচ্যাম চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ভিয়েতনাম ও ভারত ইতোমধ্যে এফটিএ করেছে। বাংলাদেশেরও একই পথে হাঁটতে হবে না হলে বিনিয়োগ ও বাজার হারাতে হবে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যদি সরকার বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংকিং, কাস্টমস ও আইন-কানুনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে এবং এফটিএর উদ্যোগ নেয়, তবে বাংলাদেশ বাজার হারাবে না।
বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল যোগ করেন, ভারতের মতো শক্তিশালী অবকাঠামো ও কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত না হলে ইউরোপ বাংলাদেশকে এফটিএতে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী হবে না।
বাংলাদেশের জন্য এখন সময় সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ও অবকাঠামোগত সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে ২০২৯ সালের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।