চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ পাহাড়। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ ও আবাসন সম্প্রসারণের চাপে একের পর এক পাহাড় সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগর এলাকায় অবস্থিত আলোচিত ‘নাগিন পাহাড়’ও এখন একই সংকটের মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পাহাড়টির চারপাশে আবাসিক ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠছে। কোথাও পাহাড়ের ঢাল কেটে সমতল করা হয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ঘেঁষে প্লট তৈরি করে নির্মাণকাজ চলছে। ফলে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে পাহাড়টির বিস্তৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় পরিবেশগত ভারসাম্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় পাহাড়টির পাদদেশে খোলা মাঠ ও ফাঁকা জায়গা থাকলেও বর্তমানে সেখানে নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি প্লটের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও নির্মাণকাজের প্রস্তুতির চিহ্নও চোখে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চন্দ্রনগর এলাকায় একসময় প্রায় ১৭টি ইটভাটা ছিল। ওইসব ইটভাটার জন্য আশপাশের টিলা ও উঁচু ভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হতো। ২০০৭ সালের পর প্রশাসনিক পদক্ষেপে ইটভাটাগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও পরবর্তীতে ওই এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে বহুতল ভবন ও আবাসিক প্রকল্প। এর প্রভাব পড়েছে নাগিন পাহাড়ের ওপরও।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দা আরিফ জানান, কয়েক দশক আগে এলাকাটি ছিল টিলা ও পাহাড়ে ঘেরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ টিলা বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে নাগিন পাহাড়টিই অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়গুলোর একটি।
পরিবেশবিদ ও আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড় কেটে বা যথাযথ অনুমোদন ছাড়া পাহাড়ের ওপর স্থাপনা নির্মাণ দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং নির্মাণবিষয়ক বিভিন্ন বিধিমালায় পাহাড় ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসানের মতে, পাহাড় রক্ষায় আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, পরিকল্পনাহীন নির্মাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বৈশিষ্ট্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর নাগিন পাহাড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে নোটিশ দিয়ে শুনানির জন্য তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলমান কয়েকটি মামলার বিচারও আদালতে চলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নাগিন পাহাড় বর্তমানে বিশেষ নজরদারির আওতায় রয়েছে। অতীতে পাহাড় সংলগ্ন ইটভাটা উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং বর্তমানে যেন নতুন করে পাহাড় কাটার ঘটনা না ঘটে, সে জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।
বায়েজিদ এলাকার ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, পাহাড় রক্ষায় একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়টির নামকরণের পেছনে রয়েছে লোকমুখে প্রচলিত একটি ধারণা। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা গঠন এবং এলাকায় একসময় বিষধর সাপের উপস্থিতির কারণে এটি ‘নাগিন পাহাড়’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়গুলো একসময় শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। নাগিন পাহাড়ের বর্তমান অবস্থা সেই আশঙ্কারই আরেকটি উদাহরণ।