জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব দেখা দেয়। জনরোষ ও বিভিন্ন হামলার শিকার হয়ে শীর্ষ নেতৃত্বসহ অনেক কর্মকর্তা আত্মগোপনে চলে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশকে পুনর্গঠন করা হয় আর চলতি বছরে বিএনপি সরকারের নেতৃত্বে নতুনভাবে আরও এক দফা রদবদল করা হয়। তবে এই সব পরিবর্তনের পরও পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
৫ আগস্টের ঘটনা এখনও বাহিনীর মধ্যে মানসিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। একসময় অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতিতে দৌড়ে পালাত কিন্তু এখন বিভিন্ন এলাকায় পুলিশই হামলার শিকার হচ্ছে। যানবাহনের চালকেরা ট্রাফিক পুলিশকে আগে যেমন সম্মান করত এখন অনেক জায়গায় তাদের সঙ্গে তর্ক-যাচ্চা এবং গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নারায়ণগঞ্জ, মোহাম্মদপুর ও অন্যান্য এলাকায় থানা ঘেরাও সহ প্রকাশ্যে বিক্ষোভের ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছয় মাসে সারাদেশে পুলিশকে লক্ষ্য করে ২৮৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলছে। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি হারানোর ভয় ও ভেতরের গ্রুপিংয়ের দ্বন্দ্ব পুলিশের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি খুন এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাই, খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেট এলাকায় কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসী গ্রুপ রাতেও সড়কে ঘোরাঘুরি করছে, কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি কার্যকর হচ্ছে না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুলিশের সম্পূর্ণ সক্রিয়তা না ফিরলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপরাধের ভিডিও জনমনে ভয় সৃষ্টি করছে, মানুষের চলাচল সীমিত করছে এবং মানসিক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেছেন, পুলিশকে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ়ভাবে কাজ করতে হবে। এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশের ছন্দপতন এখনো স্বাভাবিক হয়নি এবং পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা এখন দেশের বাইরে বা আত্মগোপনে থাকায় মাঠে কাজ করা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ বেড়েছে।
সর্বশেষ পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন এবং এই ঘাটতি অপরাধীদের সুযোগ দেয়।