জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সেই প্রতিরোধই পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনীর সাংগঠনিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং সাধারণ মানুষ, ছাত্র, যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তা সর্বজনীন মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীর রাওয়া হেলমেট হলে আয়োজিত ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্পিকার জানান, তার শুরুতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সে সময় তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় ছিলেন, পাশাপাশি শিক্ষকতা ও সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ মালিকের অনুপ্রেরণায় তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে নিজের আগ্রহে ফাইটিং আর্মে স্থানান্তর হয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের সুযোগ পান।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ চলাকালে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান তাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে অন্য সব বিকল্প উপেক্ষা করে তিনি এই রেজিমেন্টকেই নিজের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন এবং ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে যশোরে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন বলেন, এই বাহিনী গঠনে মেজর আব্দুল গণির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইতিহাসে তা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। একইভাবে ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকারী ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের ভূমিকাও প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি পায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত ভিত্তি নির্মাণে তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক আন্দোলন প্রথমে স্বায়ত্তশাসন ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হলেও ২৫ মার্চের গণহত্যার পর তা পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়। সে সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ না হলে স্বাধীনতার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারত।
স্পিকার বলেন, মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার। তাদের নেতৃত্বেই ধীরে ধীরে প্রায় এক লাখ সদস্যের মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে এবং নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালিত হয়।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল গোটা বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়।
হাফিজ উদ্দিন আরও বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাই এই রেজিমেন্ট কেবল একটি সামরিক ইউনিট নয়, বরং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেই মানুষের কাছে পরিচিত।
তিনি নৌ ও বিমানবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। কর্ণফুলী নদীতে লিমপেট মাইন ব্যবহার করে পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস এবং সীমিত সামর্থ্য নিয়েও বিমান অভিযান পরিচালনার ঘটনাকে তিনি বাঙালির সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্যে আরও উঠে আসে, মাত্র ২৫ জন সেনা কর্মকর্তা, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন এবং ইপিআরের বিদ্রোহী সদস্যদের নেতৃত্বেই মুক্তিবাহিনীর প্রাথমিক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। পরে লাখো মানুষ এতে যুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামকে সফল করে।
নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্পিকার বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবগাথা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, এটি পুরো জাতির ঐতিহ্য। দেশের সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো ভবিষ্যতেও স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।