বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও সংকটে রয়েছে, যদিও বিভিন্ন সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুনভাবে সংস্কার ও তৎপরতা শুরু করলেও পুঁজিবাজারে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং গত ২০ মাসে ডিএসইর সার্বিক সূচক ৮ শতাংশ কমে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাড়িয়ে তুলেছে।
কমিশনের নতুন নেতৃত্বের অধীনে যেভাবে বাজার পরিচালনা করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। খন্দকার রাশেদ মাকসুদ নেতৃত্বাধীন বিএসইসি পুঁজিবাজারের কারসাজি রোধের চেষ্টা করলেও বাজারের মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এর প্রমাণ হলো গত দুই বছরে পুঁজিবাজারে একটিও আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আসেনি যা বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ছিল ৫ হাজার ৭৭৮ পয়েন্ট, তবে গত ২৭ এপ্রিল এই সূচক কমে ৫ হাজার ৩০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে—অর্থাৎ, ২০ মাসে প্রায় ৪৭৮ পয়েন্ট বা ৮.২৭ শতাংশ কমেছে। এই সংকটের জন্য অনেকেই বিএসইসি’র অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন।
বিএসইসি সম্প্রতি নানা কাঠামোগত পরিবর্তন, নতুন বিধিমালা প্রণয়ন, এবং টাস্কফোর্স ও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তবে বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে তেমন কোনো সফলতা দেখা যায়নি। এর ফলে বাজারে আস্থাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিএসইসি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি। অনেক কর্মকর্তার উপর বিশ্বাসের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাজারের গতিপ্রকৃতিতে বাধা সৃষ্টি করেছে যা বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
একটি বড় দুঃখজনক ঘটনা হলো, ৫টি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত যা হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে বিপুল ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিএসইসি এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। মাহ সিকিউরিটিজ হাউজ এর বিনিয়োগকারী মো. সাজিদ হোসেন বলেন, বর্তমান কমিশন সংস্কারের পেছনে বেশি সময় কাটিয়েছে কিন্তু বিনিয়োগের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদ এর সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, দুই বছরে ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি বাজারে আসেনি যা হতাশাজনক।
এছাড়া বাজারের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমআইএ) এর সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে হলে অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।
বর্তমান কমিশনের ব্যর্থতার কারণে পুঁজিবাজারে বড় বিনিয়োগের অভাব এবং স্বচ্ছতা না থাকার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে সরে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির উপরও পড়ছে। ডিএসই এর এক পরিচালক বলেন, বিএসইসি পুনর্গঠন না হলে সঞ্চয় এবং জাতীয় অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত এবং কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজন এবং সরকারের নজরদারি ও সমর্থন ছাড়া পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।