জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাত-পা হারানো, দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়া কিংবা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারানো বহু মানুষের জীবন এখনও স্বাভাবিক হয়নি। দীর্ঘ চিকিৎসা, কৃত্রিম অঙ্গের ব্যবহার, নিয়মিত ফলোআপ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের বড় লড়াই এখন পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আহত জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য ৩,২৪১ জনের একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১,৯৩৭ জনের তালিকা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, জীবিকার ব্যবস্থা হয়েছে মাত্র ১৫০টি পরিবারের।
বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪,০০০ আহত ব্যক্তি নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২,৫০০ জনকে নিয়মিত ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয়। অন্তত ২,০০০ জন স্থায়ীভাবে অঙ্গ হারিয়েছেন বা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো ১৫৪ জনের মধ্যে এখনও ৩৯ জন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন। দেশে ফিরে আসা গুরুতর আহতদের মধ্যে ২৫ জন এখনও শয্যাশায়ী আর ৭ জন সিএমএইচে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আহতদের অভিযোগ, সরকারি সহায়তা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত এবং কৃত্রিম অঙ্গ পরিবর্তনের ব্যয়ের তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। অনেকেই মনে করছেন, এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন চিকিৎসা নয়, বরং পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও মানসিক সহায়তা।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, দুই হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন। তিনি জানান, ৬,৪০০ জন আহতকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও জীবিকার ব্যবস্থা করা গেছে মাত্র ১৫০টি পরিবারের।
নারায়ণগঞ্জের রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি পা হারিয়েছেন। এখন বাবার ছোট দোকানে বসে দিন কাটান। তার অভিযোগ, প্রতিশ্রুত এককালীন অনুদানের পুরো অর্থ পাননি এবং মাসিক ভাতাও কয়েক মাস ধরে বন্ধ।
মিরপুরের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম কৃত্রিম পা ব্যবহারের সময় তীব্র ব্যথায় ভুগছেন। ক্ষতস্থানে সমস্যা হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ঘরবন্দি।
কারওয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই চোখের দৃষ্টি হারানো সাব্বির আহমেদ এখন ব্রেইল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। চার মাস বয়সী সন্তান নিয়ে তার সংসার চলছে সরকারি ভাতার ওপর। তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার কাজের সুযোগ। ভাতা দিয়ে জীবন চলে না।
পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, গুরুতর আহতদের অনেকের ক্ষেত্রেই কৃত্রিম অঙ্গ বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন অঙ্গ সংযোজন করতে হবে, ফলে তাদের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ছররা গুলিতে আহত প্রায় এক হাজার ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন এবং ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান এবং বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এ পর্যন্ত ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকা।
বর্তমানে ১৪,৩৭০ জন আহত ব্যক্তি মাসিক ভাতার আওতায় রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও আহতদের বড় অংশ এখনও কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।