সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা কি শুধু বেতন পান নাকি এর বাইরে আরও বড় পরিসরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী আসন বণ্টন ঘিরে।
বাস্তবে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা আইনগতভাবে সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমান মর্যাদা, ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগ করেন। সংবিধান ও বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, ‘এমপি মানে এমপি’ এখানে সংরক্ষিত বা সাধারণ আসনের মধ্যে কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক বৈষম্য নেই। ফলে তাদের বেতন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা একই কাঠামোর অধীনেই নির্ধারিত।
সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সুবিধা মূলত নির্ধারিত হয়েছে “সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩ এর আওতায়, যা সময়ের সঙ্গে সংশোধিত হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য মাসিক ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান।
তবে এই অঙ্কের বাইরে ভাতার একটি বড় কাঠামো রয়েছে যা মিলিয়ে একজন এমপির মাসিক আয় অনেক গুণ বেড়ে যায়। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরাও একই নিয়মে এই সুবিধা পান।
বেতনের পাশাপাশি নির্বাচনি এলাকা ভাতা হিসেবে মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা, আপ্যায়ন ভাতা ৫ হাজার টাকা, অফিস পরিচালনা ব্যয় ১৫ হাজার টাকা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিবিধ ভাতা হিসেবে ৬ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো মাসিক ৭০ হাজার টাকা ভাতা, যা জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় বহন করে। পাশাপাশি লন্ড্রি ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকাও যুক্ত থাকে। এসব সুবিধা মিলিয়ে একজন এমপির মাসিক আর্থিক কাঠামো বেতনের তুলনায় বহুগুণ বিস্তৃত।
সংসদ সদস্যদের জন্য আরেকটি বড় সুবিধা হলো সরকারি বাসস্থান। সংসদ ভবন এলাকায় বা নির্ধারিত এলাকায় এমপিদের জন্য আলিশান ফ্ল্যাট বরাদ্দ থাকে যা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এর বাইরে টেলিফোন ও যোগাযোগ সুবিধাও দেওয়া হয়, যেখানে মাসিক নির্দিষ্ট ভর্তুকি রাষ্ট্র বহন করে।
ভ্রমণ সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যরা বিশেষ সুবিধা পান। সংসদ অধিবেশন বা কমিটির কাজে যাতায়াতে রেল, নৌ বা বিমানে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা প্রদান করা হয়। সড়কপথে কিলোমিটারভিত্তিক ভাতা নির্ধারিত থাকে। এছাড়া বছরে একটি নির্দিষ্ট ভ্রমণ ভাতা বা ট্রাভেল পাস সুবিধাও দেওয়া হয় যার মাধ্যমে দেশের ভেতরে সরকারি দায়িত্ব পালনের যাতায়াত ব্যয় বহন করা হয়।
অধিবেশন বা কমিটির সভায় অংশগ্রহণ করলে দৈনিক ভাতাও পাওয়া যায়। উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রতিদিন নির্ধারিত হারে ভাতা ও যাতায়াত খরচ দেওয়া হয়, যা সংসদীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। দায়িত্ব পালনের সময় দাফতরিক কাজ বা অবস্থানের ক্ষেত্রেও আলাদা দৈনিক ভাতা প্রদান করা হয়।
চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যরা সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের সুবিধা পান। পাশাপাশি মাসিক চিকিৎসা ভাতা এবং পরিবারসহ চিকিৎসা সেবা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়। নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় ১০ লাখ টাকার বিমা সুবিধাও রয়েছে, যা দুর্ঘটনা বা দায়িত্ব পালনকালীন অঘটনের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়।
এছাড়া এমপিদের জন্য বছরে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহারের সুযোগ থাকে যা উন্নয়নমূলক বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যায়। টেলিযোগাযোগ সুবিধা, অফিস ব্যয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ভাতাও এই কাঠামোর অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংসদ সদস্যদের সব ধরনের ভাতা ও সুবিধা আয়করমুক্ত। অর্থাৎ, এসব অর্থের ওপর কোনো কর আরোপ করা হয় না, যা তাদের আর্থিক সুবিধাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।