জাতীয় সংসদে গাড়ি সুবিধা নিয়ে সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের পর আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন কুমিল্লা–৪ (দেবিদ্বার) আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। নির্বাচনের আগে ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সংসদে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে গাড়ির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি।
এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে বলছেন এটি তার আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, আবার কেউ কেউ মনে করছেন ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি না নেওয়া এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা চাওয়া দুটি আলাদা বিষয়।
ঘটনার সূত্রপাত সংসদের এক অধিবেশন থেকে। উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের বসার জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ তৈরির সিদ্ধান্তের কথা জানালে তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান হাসনাত আবদুল্লাহ।
বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যানদের সরকারি গাড়ি থাকে কিন্তু অনেক সময় সংসদ সদস্যদের ভাড়া করা গাড়িতে চলাচল করতে হয়। মানুষের কাছে যাওয়া এবং নির্বাচনি এলাকায় কাজ করার জন্য যদি একটি গাড়ির ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তাদের দায়িত্ব পালন সহজ হবে। তার এই বক্তব্যে সংসদ কক্ষে হাস্যরসের পরিবেশ তৈরি হয় এবং অনেক সদস্য টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
তবে এই বক্তব্য সামনে আসার পর আবারও ভাইরাল হয়ে ওঠে নির্বাচনের আগে দেওয়া তার একটি বক্তব্য। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লার দেবিদ্বারে এক নির্বাচনি উঠান বৈঠকে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছিলেন, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি কিনবেন না এবং পরিবারকেও এই সুবিধা নিতে দেবেন না। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে এমপিদের জন্য চালু থাকা শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত এবং রাজনীতিতে সরলতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
এই প্রসঙ্গেই এখন নতুন করে আলোচনা হচ্ছে—বাংলাদেশে সংসদ সদস্যরা আসলে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান। আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের বেতন ও ভাতা নির্ধারিত হয়েছে ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী, যা বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত হয়েছে। বর্তমানে একজন সংসদ সদস্য মাসিক ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান। এর পাশাপাশি নির্বাচনি এলাকা ভাতা হিসেবে ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং আপ্যায়ন ভাতা হিসেবে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
এছাড়া যাতায়াতের জন্য সংসদ সদস্যরা মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান। এই ভাতার মধ্যে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন অন্তর্ভুক্ত থাকে। নির্বাচনি এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য আরও প্রায় ১৫ হাজার টাকা অফিস ব্যয় ভাতা দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য লন্ড্রি ভাতা, বিবিধ ব্যয় ভাতা ইত্যাদিও রয়েছে, যা দিয়ে দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা খরচ মেটানো যায়।
ভ্রমণের ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। সংসদের অধিবেশন, সংসদীয় কমিটির সভা বা দায়িত্বসংক্রান্ত কাজে যাতায়াতের জন্য তারা বিমান, রেল বা জাহাজে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা পেতে পারেন। সড়কপথে যাতায়াত করলে কিলোমিটারপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ভ্রমণ ভাতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য বছরে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকার সমপরিমাণ ট্রাভেল পাস সুবিধাও রয়েছে। সংসদ অধিবেশন বা কমিটির সভায় অংশ নিলে উপস্থিতির ভিত্তিতে দৈনিক ভাতাও দেওয়া হয়।
চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবার সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা পান। পাশাপাশি মাসিক চিকিৎসা ভাতাও রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংসদ সদস্যদের জন্য ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধাও রাখা হয়েছে, যা দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়।
এছাড়া সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয় এবং টেলিফোন বিল বাবদ মাসিক নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করা হয়। সংসদ সদস্যরা বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহারের সুযোগও পান, যা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সামাজিক বা মানবিক কাজে ব্যয় করা যায়।
সংসদ সদস্যদের সবচেয়ে আলোচিত সুবিধাগুলোর একটি ছিল শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে একজন সংসদ সদস্য তার মেয়াদকালে কর ও শুল্ক ছাড়ে একটি গাড়ি আমদানি করতে পারতেন। পাঁচ বছর পর আবার একই সুবিধা নেওয়ার সুযোগও ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বর্তমান সংসদের বিভিন্ন দল ও নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জনপ্রত্যাশা বিবেচনায় এমপিদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা কমানোর বিষয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। তাই শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিলের বিষয়টিও এখন নীতিগত আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা থাকলেও গাড়ি সুবিধা নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা রাজনীতির পাশাপাশি জনমতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য সেই আলোচনাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।