‘সাহিত্যে সৃজন, সৃজনে মানবতা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়াই রাইটার্স’ ওয়েব বাংলাদেশের অঙ্গীকার’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাহিত্যচর্চা, সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে দেশ-বিদেশে বিস্তারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে রাইটার্স’ ওয়েব বাংলাদেশ।
প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের রাইটার্স’ ওয়েব বাংলাদেশ সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে দুই বিশিষ্ট কবি আতাউল হক সিদ্দিকী ও শিশির চাকমাকে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে নীরব নিষ্ঠা, সৃজনশীল সাধনা এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। প্রচারের আড়ালে থেকেও তাদের সাহিত্যকর্ম পাঠকসমাজে মূল্যায়িত হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
কবি আতাউল হক সিদ্দিকী : কবি আতাউল হক সিদ্দিকীর জন্ম অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার (বর্তমান নওগাঁ) পত্নীতলা উপজেলার আমাইড় গ্রামে। বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন ধামইরহাট উপজেলার বীরগ্রামে। ছাত্রজীবনে তিনি নওগাঁ মহকুমা ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৮ সালের গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে ভারতের বালুরঘাট ও বোয়ালদাড় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন।
স্বাধীনতার পর সাংবাদিকতা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭২ সালে বেসরকারি এবং ১৯৮৪ সালে সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ২০০৩ সালে অবসরে গেলেও সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন।
১৯৬৪ সালে গল্প লেখার মাধ্যমে তার সাহিত্যজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে কবিতা, বিশেষ করে সনেট রচনায় তিনি নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বিবাগী বসন্ত বাউল যৌবন, আমি সেই লোক, উড়ে যায় মরমি পাখি, বেপথু কীর্তনীয়া এবং বরেন্দ্র বাউল। এসব কাব্য একত্রে সনেট সমগ্র নামে প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, আঞ্চলিক ইতিহাস, আদিবাসী জীবন ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধও সমাদৃত। তিনি বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য এবং এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের সদস্য।
কবি শিশির চাকমা : ১৯৬৩ সালে রাঙ্গামাটিতে জন্মগ্রহণ করেন কবি শিশির চাকমা। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতিনির্ভর পরিবেশে। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি মূলত চাকমা ভাষায় কবিতা ও ছোটগল্প রচনা করে নিজস্ব সাহিত্যধারা নির্মাণ করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। ২০২৩ সালে অবসর গ্রহণের আগে তিনি রাঙ্গামাটির একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় তার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জুম অ্যাস্থেটিকস কাউন্সিল (জাক)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম রাইটার্স ইউনিয়ন-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। চাকমা ভাষায় প্রকাশিত তার কাব্যগ্রন্থ তে এব (তার অপেক্ষায়) পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়েছে। মাতৃভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছেন।
রাইটার্স’ ওয়েব বাংলাদেশ এর সাধারণ সম্পাদক তালুকদার লাভলী বলেন, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে কবিতা মানুষের চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে তরুণদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেই এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি প্রত্যাশা করেন এই পুরস্কার দুই কবির সাহিত্যসাধনাকে নতুনভাবে মূল্যায়িত করবে এবং দেশের নবীন লেখকদের সৃজনশীল সাহিত্যচর্চায় আরও অনুপ্রাণিত করবে।
উল্লেখ্য, রাইটার্স’ ওয়েব বাংলাদেশ মনে করে, সাহিত্য শুধু সৃজনশীল প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তারও শক্তিশালী বাহন। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর নীরবে সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত লেখকদের সম্মানিত ও পুরস্কার দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।