সাভারের রানা প্লাজা ধসের ভয়াল ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি বিচার, মেলেনি পূর্ণ ক্ষতিপূরণ। বিশ্বের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক। আহত ও পঙ্গু হন কয়েক হাজার শ্রমিক। দীর্ঘ এক যুগ পার হলেও নিহতদের পরিবার ও বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের অনেকেই আজও ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে। মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষী থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
উচ্চ আদালত ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলেও সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতির কারণে বিচার কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার প্রধান আসামি ভবনের মালিক সোহেল রানা কারাগারে থাকলেও অন্য আসামিদের অনেকেই জামিনে বা পলাতক রয়েছেন। হত্যা মামলায় বর্তমানে ৩৭ জন আসামি রয়েছে যার মধ্যে ২৫ জন জামিনে এবং ১১ জন পলাতক।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে করা আরেকটি মামলার বিচারও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। মামলাটিতে ১৩৫ জন সাক্ষী থাকলেও এখন পর্যন্ত একজনেরও সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। আদালতে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে শুনানি।
দুর্ঘটনার পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কিছু অর্থ সহায়তা দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে তা প্রকৃত ক্ষতিপূরণ নয় বরং অনুদান মাত্র। আহত অনেক শ্রমিক সেই অর্থ চিকিৎসা খরচেই শেষ করে ফেলেছেন।
যারা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভাবে অনেকে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, এত বড় ট্র্যাজেডির পরও নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও আহতদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। অনেক শ্রমিক এখনো চিকিৎসা ও জীবিকা সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর দেওয়া অনুদানকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শ্রম আইন অনুযায়ী প্রকৃত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব নিয়োগকর্তাদেরই।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বলেন, রানা প্লাজা ও তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কিছু কারখানায় ভবন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা উন্নত হলেও সামগ্রিক পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
তার মতে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক কারখানায় তা কার্যকর হয়নি।
শ্রমিক নেতারা জানান, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে পোশাক শ্রমিকদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ন্যূনতম জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা বা পেনশনের মতো সুবিধা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে শ্রমিক সংগঠনগুলো দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা এবং শিল্প খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তাদের মতে, এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি ভবন ধস নয়; এটি ছিল অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নজরদারির অভাবের করুণ পরিণতি।
শ্রমিকদের প্রশ্ন রানা প্লাজার নিহত শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পেতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?
মানুষের মাঝে