মাছের শরীরে ভারী বা বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি এখন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় ও নদী-সংলগ্ন অঞ্চলে এসব ক্ষতিকর ধাতুর পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
আর্সেনিক, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেলসহ বিভিন্ন ধাতুকে বিষাক্ত বা ভারী ধাতু বলা হয়। এগুলোর সামান্য উপস্থিতিও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এসব ধাতুর প্রভাবে শরীরে দেখা দিতে পারে : শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা
কিডনিজনিত জটিলতা, স্নায়বিক দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি, মাথাব্যথা, বমিভাব, অবসাদ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া।
বিশেষ করে ক্যাডমিয়াম, সিসা ও ক্রোমিয়াম শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী ধাতুদূষণ বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি বিভিন্ন নদী ও মোহনা অঞ্চল যেমন মাতামুহুরী নদী, বাকখালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এলাকায় পরিচালিত হয়।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে বাকখালী ও মহেশখালী এলাকায়, যেখানে দূষণের মাত্রা উচ্চমাত্রার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকায় ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতিও অত্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারী ধাতুদূষণের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে :
শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের দূষিত পানি, জাহাজ ভাঙা, শিল্পের বর্জ্য, নগর ও কৃষি বর্জ্য।
এসব দূষণ সরাসরি নদী ও সমুদ্রের পানিতে মিশে জলজ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জলজ পরিবেশে থাকা ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও জুওপ্লাঙ্কটন এসব ধাতু শোষণ করে। এরপর ছোট মাছ থেকে বড় মাছ পর্যন্ত খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রায় ৭১০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এবং এটি দেশের মৎস্য ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে লক্ষাধিক মানুষ মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত এবং বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদন হয়।
তবে শিল্পায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এই অঞ্চল এখন পরিবেশগত চাপে রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন গবেষণায় মাছের শরীরে বিপজ্জনক ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কিছু বাণিজ্যিক মাছেও ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেশি পাওয়া গেছে যা স্বাভাবিক সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন : শিল্প ও নগর বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা, নদী ও জলাশয়ে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, মাছ চাষের পুকুর নিয়মিত পরিষ্কার রাখা
দূষণ উৎস চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণ করা. পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা
মাছের শরীরে বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয় এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত একটি বড় সংকেত। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই দূষণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।