পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার একসময় ছিল জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, অযত্ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে বর্তমানে এটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। পাঠাগারটি এখন যেন এক জীবন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে ব্যবহারকারীদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঠাগারের ভবনের বিভিন্ন অংশে পলেস্তরা খসে পড়ছে এবং ছাদজুড়ে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। দেয়ালের রঙ উঠে ইট পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পানির দাগ, যা দীর্ঘদিনের অবহেলার নীরব সাক্ষ্য বহন করছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে—ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে, মেঝে ভিজে থাকে এবং মূল্যবান বইগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
এছাড়া পাঠাগারের পাশের সড়ক উঁচু করে নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি সরাসরি ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। নিচতলায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
একসময় যেখানে পাঠকদের ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। পাঠোপযোগী পরিবেশের অভাবে পাঠকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, পাঠাগারের কিছু অংশ বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
পাঠাগারটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের স্মৃতি ও আবেগ। স্থানীয়দের মতে, জাতীয় পার্টির শাসনামলে ১৯৮৪ সালের ৮ আগস্ট উদ্বোধিত এই পাঠাগারটি কবি মুহাম্মদ আবদুল খালেকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় এটি ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এমনকি মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবের প্রাথমিক কার্যক্রমও এই পাঠাগারের একটি কক্ষে পরিচালিত হয়েছে।
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জাহিদ উদ্দীন বলেন, “এই পাঠাগারে আমরা বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছি। এখন এর বর্তমান অবস্থা দেখে কষ্ট লাগে।”
অপর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম আজাদী বলেন, “একসময় এখানে বইয়ের আড্ডা জমত। এখন ভবনের অবস্থা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে ভেতরে ঢুকতেও ভয় লাগে।”
পাঠাগারের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মোঃ নুর হোসেন মোল্লা জানান, “পাঠাগারটি পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি।”
বর্তমানে পাঠাগারে নেই পর্যাপ্ত বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা, নেই প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বা পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুবিধা। সব মিলিয়ে এটি একটি মুমূর্ষু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে পাঠাগারটিকে রক্ষা করা জরুরি। অন্যথায়, অবহেলার কারণে হারিয়ে যেতে পারে মঠবাড়িয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।
স্থানীয়দের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের সচেতন মানুষ একযোগে এগিয়ে এলে এই পাঠাগারকে পুনরায় জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।
জ্ঞানের এই বাতিঘর নিভে যাওয়ার আগে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি—নয়তো ইতিহাসের এক মূল্যবান অধ্যায় হারিয়ে যাবে চিরতরে।