ঈদের ছুটিতে যখন রাজধানীর অধিকাংশ সরকারি দপ্তর ও হাসপাতাল তুলনামূলক ফাঁকা থাকে, তখন ঢাকার শিশু হাসপাতালগুলোতে ছিল ভিন্ন চিত্র। উৎসবের আমেজের পরিবর্তে সেখানে দেখা গেছে উদ্বেগ, ব্যস্ততা আর অসুস্থ শিশুদের কান্নায় ভরা এক কঠিন বাস্তবতা। বিশেষ করে এবারের ছুটিতে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালজুড়ে সৃষ্টি হয় বাড়তি চাপ। সকাল থেকেই জরুরি বিভাগের সামনে ছিল দীর্ঘ লাইন। কোলে জ্বরাক্রান্ত শিশু, কারও গায়ে ফুসকুড়ি, কারও কাশি বা শ্বাসকষ্ট এমন নানা উপসর্গ নিয়ে বাবা-মায়েরা ছুটে এসেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ঈদের আনন্দ তাদের জন্য ছিল গৌণ; সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল সন্তানের সুস্থতা। চিকিৎসকদের মতে, এবারের ছুটিতে সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছে হাম নিয়ে। অনেক অভিভাবক প্রথমে এটিকে সাধারণ জ্বর বা ঠান্ডা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের আলাদা করে রাখা জরুরি। এই বাস্তবতায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি পুরো ওয়ার্ডকে আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তর করে। শুরুতে সীমিত বেড থাকলেও রোগীর চাপ বাড়ায় তা দ্রুত বাড়াতে হয়। এমনকি চিকিৎসকদের ব্যবহৃত কক্ষও রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। পুরোনো ও অচল বেড মেরামত করে চালু করা হয় যাতে কোনো শিশুকে ফিরিয়ে দিতে না হয়। পুরো ব্যবস্থাপনা চালাতে চিকিৎসক ও নার্সদের রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম সরাসরি প্রাণঘাতী না হলেও এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এমনকি মেনিনজাইটিসের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউ সাপোর্ট পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে দেখা গেছে উদ্বিগ্ন মায়েদের অপেক্ষা। কেউ কোলে শিশুকে নিয়ে বসে আছেন, কেউ বারবার কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপছেন। একজন মা জানান, প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন সাধারণ জ্বর। পরে ফুসকুড়ি ও কাশি বাড়লে চিকিৎসক তাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেন। এখন সন্তানের অবস্থার উন্নতি হলেও তার ভয়ের শেষ নেই। হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অনেক শিশু হাম থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে যা চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলছে। ঈদের ছুটিতে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে কয়েকজন চিকিৎসক থাকার কথা সেখানে একজন দিয়েই শিফট চালাতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই জনবল ঘাটতি থাকায় এই চাপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গুরুতর রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আইসিইউ ও এইচডিইউতে পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধার অভাব। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। প্রয়োজনের তুলনায় আইসোলেশন বেড খুবই সীমিত হওয়ায় চিকিৎসকদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। অনেক পরিবারই দরিদ্র। একটি শিশুর অসুস্থতা মানে শুধু চিকিৎসা ব্যয় নয়, পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনেক মা কাজ ছেড়ে হাসপাতালে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। হাসপাতালটি বড় হলেও এখনও অনেক প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত বেড, প্রশিক্ষিত জনবল সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। এসব ঘাটতি পূরণে বড় পরিসরের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও তা বাস্তবায়নে সময় লাগছে। হামের এই প্রাদুর্ভাব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শিশুস্বাস্থ্য খাতে আরও বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা জরুরি। শুধু চিকিৎসা নয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বিশেষ করে টিকাদান জোরদার করা প্রয়োজন।