একটি ভ্যান। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি বাহন। কিন্তু কুষ্টিয়ার কুমারখালীর প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক মোশারফ হোসেনের কাছে সেটিই ছিল সংসারের প্রাণভোমরা, বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। সেই ভ্যানটিই চুরি হয়ে যাওয়ার পর আজ তিনি যেন দিশেহারা। অসুস্থ স্ত্রী, বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কীভাবে দিন চলবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না ৬১ বছর বয়সী এই মানুষটি।
কুমারখালী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোশারফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। প্রায় তিন বছর আগে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলাফেরা করলেও সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে থেমে থাকেননি। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো তা দিয়েই চলত তার ছোট্ট সংসার।
কিন্তু গত মঙ্গলবার (২ জুন) সন্ধ্যায় মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় সবকিছু।
সেদিন মাগরিবের নামাজ আদায়ের জন্য উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া বড় জামে মসজিদের সামনে নিজের ভ্যানটি রেখে ভেতরে প্রবেশ করেন মোশারফ। নামাজ শেষে বাইরে এসে দেখেন যেখানে ভ্যানটি রেখে গিয়েছিলেন সেখানে আর কিছুই নেই। অজানা কোনো চোর তার জীবিকার একমাত্র সম্বলটি নিয়ে গেছে।
প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি তিনি। আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেছেন, পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। কিন্তু কোথাও ভ্যানটির কোনো সন্ধান মেলেনি। শেষ পর্যন্ত বুধবার (৩ জুন) কুমারখালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
ঘটনার চার দিন পর শনিবার (৬ জুন) ভ্যানের খোঁজ নিতে থানায় গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোশারফ। অসহায় কণ্ঠে তিনি বলেন, নামাজ পড়ে বাইরে এসে দেখি ভ্যানডা নাই। চার দিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেছি। কোনো লাভ হচ্ছে না। ভ্যানটুকুর ওপরই সংসার চলত। আমি অসুস্থ, বউডা অসুস্থ, বৃদ্ধ মা অসুস্থ। ঘরে চাল-ডাল নাই, ওষুধপত্র নাই। সবকিছুর খরচ ওই এক ভ্যানের ওপর চলতো। এখন সেটাও হারাইছে। তার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, চোখে ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা।
পরিবারের অবস্থা আরও করুণ। স্ত্রী আলেয়া খাতুন নিজেও অসুস্থ। তিনি জানান, দুইবার স্ট্রোক করেছেন তিনি। অন্যদিকে শাশুড়ির কোমর ভাঙা। পরিবারের তিনজনই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।
আলেয়া খাতুন বলেন, আমি দুইবার স্ট্রোক করিছি। শাশুড়ির মাজা ভাঙা। কয়েকদিন ধইরা ওষুধ খাইতে পারতেছি না। ঘরে বাজার নাই। ভ্যান চালাইয়াই সংসারটা চলতো। ভ্যানডা চুরি হওয়ার পর আর কিছুই করতে পারতেছে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোশারফ অত্যন্ত সাদাসিধে ও পরিশ্রমী মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও তিনি কখনও কারও কাছে হাত পাতেননি। নিজের শ্রমেই সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন। তাই তার এই বিপর্যয়ে এলাকার মানুষের মধ্যেও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে।
জোতমোড়া বড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, মাগরিবের নামাজের সময়ই ভ্যানটি চুরির ঘটনা ঘটে। মসজিদের সিসিটিভি ক্যামেরায় ঘটনার কিছু অংশ ধারণ হয়েছে। তবে ফুটেজে চোরের মুখ স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, সিসিটিভিতে ঘটনাটি দেখা গেছে। তবে চোরকে চেনা যাচ্ছে না। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টি তদন্ত করছে। রবিবার (৭ জুন) কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, ভ্যান হারানোর বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভ্যানটি দ্রুত উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনও মোশারফের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, ভ্যান হারানোর বিষয়টি তার নজরে এসেছে।
তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি খোঁজখবর নেওয়া হবে। বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের চেষ্টা করা হবে।
একটি ভ্যান হারানোর ঘটনা হয়তো অনেকের কাছে সাধারণ চুরির ঘটনা। কিন্তু মোশারফ হোসেনের জীবনে এটি শুধু একটি যানবাহন হারানো নয়; এটি তার পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন হারানোর গল্প। প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করা একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সেই ভ্যান ছিল স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে চলার প্রতীক।
এখন তার অপেক্ষা পুলিশ কি খুঁজে দিতে পারবে হারানো ভ্যানটি? নাকি সমাজ ও প্রশাসনের সহায়তায় আবারও নতুন করে ঘুরবে তার জীবনের চাকা? উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে মোশারফের চোখে শুধু একটাই আকুতি ‘ভ্যানডা যদি ফেরত পাই, আবার নিজের পায়ে দাঁড়াইতে পারমু’।