পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ভুয়া চিকিৎসক, অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগে একের পর এক অভিযানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপে স্থানীয় স্বাস্থ্যখাতের নানামুখী দুর্নীতি ও অনিয়ম জনসমক্ষে এসেছে, যা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উপজেলার সাফা বাজার এলাকায় একটি সার্জিক্যাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে পি সি বর্মন নামে এক ভুয়া চিকিৎসককে আটক করা হয়। পরে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনে তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই ঘটনায় ক্লিনিকের মালিক মনির হোসেনকেও জরিমানা ও স্বল্পমেয়াদি কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
এর মাত্র কয়েকদিন পর, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে নিজেকে হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পরিচয় দেওয়া সুবাস চন্দ্র মোহন্তকে আটক করা হয়। তিনি একাধিক ভুয়া নামে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন বলে জানা গেছে। তদন্তে তার বিরুদ্ধে পূর্বের প্রতারণাসহ একাধিক অভিযোগের তথ্যও পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব ভুয়া চিকিৎসকদের পাশাপাশি কিছু ডেন্টাল ক্লিনিকের কার্যক্রমও সন্দেহজনক হলেও সেগুলো এখনো তেমনভাবে নজরদারির আওতায় আসেনি।
এর আগে, ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার উদ্যোগে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর তদারকির জন্য ৮ সদস্যের একটি পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জেলা সিভিল সার্জন একটি বেসরকারি হাসপাতালের অনিয়মের অভিযোগে সেটির কার্যক্রম বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করেন।
এছাড়া, ২০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে মঠবাড়িয়ার ৭টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে। এসব অভিযোগে প্রতিষ্ঠানগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে, ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে একটি সিজারিয়ান অপারেশনের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা ও ভুয়া রিপোর্টের কারণে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এমনকি এক প্রসূতি মাকে ভুলভাবে গর্ভের সন্তান মৃত বলে জানানো হলেও পরে সন্তান সুস্থ পাওয়া যায়—যা স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
সচেতন মহল মনে করছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বরং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফল। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় কার্যকর তদারকি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান নয়—নিয়মিত তদারকি, লাইসেন্স যাচাই, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন হবে।
মঠবাড়িয়ার স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান পরিস্থিতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই খাত আস্থা ফিরে পাবে নাকি অনিয়মের চক্রেই আটকে থাকবে।