আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে সামান্য পতন দেখা গেছে। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা এ দরপতনের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবে তেলের দাম বেড়েছে যা সামগ্রিক বাজারে প্রভাব ফেলছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিনের শুরুতে স্পট স্বর্ণের দাম প্রায় ০.৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৮০৯.৭১ ডলারে নেমে আসে। এটি গত ১৩ এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন অবস্থান। এছাড়া জুন মাসে সরবরাহযোগ্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচারও প্রায় ১ শতাংশ কমে ৪,৮২৯.৪০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের আচরণে পরিবর্তন আনছে। টেস্টিলাইভের গ্লোবাল ম্যাক্রো বিভাগের প্রধান ইলিয়া স্পিভাক জানান, যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে এবং ‘যুদ্ধকালীন বাণিজ্য’ পরিস্থিতি আবারও ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে। এর ফলে মার্কিন ডলার ও বন্ড ইল্ড উভয়ই বেড়েছে। ডলার শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ফলনও বেড়েছে যা স্বর্ণের দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে তেলের দাম বেড়েছে এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি পণ্যবাহী জাহাজ আটক করার পর ইরান প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। এতে দুই দিনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন আলোচনার আশা করলেও তাতে তারা অংশ নেবে না।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে স্বর্ণের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে। তেলের দাম বেড়ে গেলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও স্বর্ণকে সাধারণত মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, তবে উচ্চ সুদের হার এই ধাতুর আকর্ষণ কমিয়ে দেয়।
ওসিবিসির কৌশলবিদ ক্রিস্টোফার ওং বলেন, স্বর্ণের দিকনির্দেশনা এখন বৈশ্বিক ঝুঁকির পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনার অগ্রগতি এর ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
বিশ্ববাজারে দাম কমায় দেশের বাজারেও কমতে পারে স্বর্ণ ও রুপার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম কমলে এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে। তাই যে কোনো সময় দাম কমানো হতে পারে।
দেশের বাজারে গত ১৫ এপ্রিল স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সেদিন ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়ানো হয়, যার ফলে বর্তমানে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা।
এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮২০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪ হাজার ৭০৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৩৭ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে, স্পট সিলভারের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৮০ দশমিক ৩৬ ডলারে নেমে এসেছে। প্লাটিনামের দাম অপরিবর্তিত থেকে ২ হাজার ১০৩ দশমিক ৩৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৫৫৬ দশমিক ৪৫ ডলারে চলে এসেছে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমলেও দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায়, স্বর্ণবাজারে ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলছে।