বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পহেলা বৈশাখ ঘিরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিশেষ করে রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।
২০০১ সালের রমনা বটমূল বোমা হামলা ২০০১ এর ভয়াবহতা এখনও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় প্রভাব রাখে। ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবারও গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
রাজধানীর শাহবাগসহ আশপাশের এলাকায় ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যারিকেড বসানো হবে। প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে ও হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হবে। বিশেষ করে রমনা পার্ক ও আশপাশে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নির্ধারিত গেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে সিসিটিভি, ড্রোন, ভিডিও ক্যামেরা এবং পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দিয়ে নিয়মিত সুইপিং করা হবে। ছিনতাই, ইভটিজিং ও পকেটমার ঠেকাতে সাদা পোশাকে বিশেষ টিম মাঠে থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) হেলিকপ্টার প্রস্তুত রেখেছে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায়।
ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সকালেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মঙ্গল শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় শুরু হয়ে নির্ধারিত রুটে চলবে। নিরাপত্তার কারণে সব অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোর থেকে শাহবাগসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচলে ডাইভারশন থাকবে। নগরবাসীকে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে মুখোশ পরে প্রবেশ, ব্যাগ বহন, আতশবাজি, ফানুস ও শব্দদূষণকারী উপকরণ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে।
উৎসবকে ঘিরে সম্ভাব্য গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে অনলাইন মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো রোধে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, সামগ্রিকভাবে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের ডিজি ঢাকাসহ সারাদেশে যতগুলো র্যাবের ব্যাটালিয়ন আছে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
পহেলা বৈশাখ ঘিরে দেশের প্রতিটি জেলায় বড় বড় আয়োজনগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাবের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটা হয় রমনার বটমূলে। এখানে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি শুরু হয়ে গেছে। এই এলাকা এবং আশেপাশের এলাকা ঘিরে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।
পাশাপাশি নববর্ষের দিন আমাদের ইউনিফর্মে ফুট পেট্রোল এবং টহলগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একভাগে আছে মোটরসাইকেল আরোহী। প্রত্যেক মোটরসাইকেলে দুইজন করে র্যাব সদস্য থাকবেন। বাকি আরেকটি যে গ্রুপ আছে সেই গ্রুপের মধ্যে আমাদের টহল পিকআপ আছে। প্রত্যেকটি পিকআপে আটজন করে র্যাব সদস্য থাকবেন।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ঘাটতি রাখছে না র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। দিনব্যাপী চলবে বহুমাত্রিক নজরদারি, যেখানে প্রযুক্তি ও জনবল—দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়।
র্যাব জানিয়েছে, অনুষ্ঠানস্থলজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার ও কন্ট্রোল রুম। এসব কন্ট্রোল রুম থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। ওয়াচ টাওয়ারে নিয়োজিত সদস্যরা সরাসরি মাঠের কার্যক্রম নজরদারি করবেন, যাতে কোনো সন্দেহজনক কিছু দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
শুধু মূল মঞ্চ নয় আশপাশের এলাকাও রাখা হয়েছে কঠোর নজরদারিতে। বিশেষ করে লেকসংলগ্ন এলাকায় র্যাব সদস্যরা টহলে থাকবেন। পাশাপাশি বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড নিয়মিত সুইপিং পরিচালনা করবে যাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই প্রতিহত করা যায়।
যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে র্যাবের হেলিকপ্টার। প্রয়োজন হলে দ্রুত মেডিকেল সহায়তা (মেডিপ্যাক) পৌঁছে দিতে নিকটস্থ খোলা স্থানে অবতরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এছাড়া উৎসব ঘিরে গুজব বা অপপ্রচার ঠেকাতে সাইবার জগতেও সক্রিয় নজরদারি শুরু করেছে র্যাব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অপচেষ্টা প্রতিরোধে অনলাইন মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নাশকতার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে সতর্কতায় কোনো শৈথিল্য নেই। তাদের প্রত্যাশা—সব ধরনের প্রস্তুতির মাধ্যমে এবারের বৈশাখ উদযাপন হবে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি কোনো নির্দিষ্ট হুমকি না থাকলেও সতর্কতায় কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। অতীত অভিজ্ঞতা, জনসমাগমের ব্যাপকতা এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এবার নিরাপত্তা পরিকল্পনা আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও জনসাধারণের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা-এ অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। মুখোশ পরে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ—তবে হাতে বহন করা যাবে। এমনভাবে মুখোশ প্রদর্শনও করা যাবে না যাতে মুখ ঢেকে যায়।
এছাড়া শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার পর নতুন করে কাউকে যুক্ত হতে দেওয়া হবে না। ইংরেজি বা ভিন্ন ভাষায় কিংবা উদ্দেশ্যবহির্ভূত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীসহ দেশব্যাপী সব বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হাতিরঝিল এবং রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় বিকেল ৫টার পর নতুন করে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
নববর্ষ ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসবকে ঘিরে সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ, এসবি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, কোস্টগার্ডের নৌ টহল এবং জরুরি সেবাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ইভটিজিং, ছিনতাই ও পকেটমার প্রতিরোধে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। ভিড়ে কেউ হারিয়ে গেলে সহায়তার জন্য রমনা পার্কে ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ কেন্দ্র চালু করা হবে।
জনসমাগমের কথা বিবেচনায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত রুট ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের পর স্টিকারবিহীন যানবাহন প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে দেশব্যাপী ফানুস, গ্যাস বেলুন, আতশবাজি ও উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী বাঁশি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি কূটনৈতিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ঠেকাতে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য সংস্থাকে সার্বক্ষণিক অনলাইন মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যেমন কঠোরতা রয়েছে তেমনি রয়েছে উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি।
পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ঘিরে রমনা পার্কে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে – ছবি : সংগৃহীত