যশোরের বারীনগর পাইকারি সবজি মোকামে ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় ব্যস্ততা। কৃষকেরা মাঠ থেকে তুলে আনা টাটকা পটল, লাউ, মুলা, বেগুন নিয়ে হাজির হন। দরদাম শেষে পটোল বিক্রি হয় মাত্র ৫৫–৫৬ টাকা কেজি দরে।
কিন্তু এই একই পটল কয়েক ঘণ্টা পরই ঢাকার বাজারে গিয়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকারও বেশি। এই দামের ব্যবধান কেবল দূরত্বের নয় এটি এক দীর্ঘ, বহুস্তরীয় বাণিজ্যিক চক্রের ফল। কৃষকের হাত থেকে পণ্য ছাড়ার পরই শুরু হয় প্রথম রূপান্তর। মোকামের ব্যাপারীরা বড় পরিমাণে সবজি কিনে শ্রমিক দিয়ে ধোয়ান, বাছাই করেন, বস্তাবন্দী করেন। এরপর সেগুলো ট্রাকে তোলা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবহন, শ্রমিক, বস্তা, খাজনা সব মিলিয়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ৮ টাকা খরচ যুক্ত হয়। ফলে কৃষকের ৫৬ টাকার পটল তখনই প্রায় ৬৪ টাকায় দাঁড়িয়ে যায়। এরপর শুরু হয় যাত্রা। যশোর থেকে ঢাকার প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রাককে থামতে হয় একাধিক জায়গায়। মধুমতী সেতু, পদ্মা সেতু, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, আড়িয়াল খাঁ সেতু—প্রতিটি স্থানে টোল দিতে হয়। এর বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে পৌর টোল, অনানুষ্ঠানিক খরচসহ ছোট ছোট ব্যয় যুক্ত হতে থাকে। অঙ্কে ছোট মনে হলেও সব মিলিয়ে এগুলো পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে।

ছবি: সংগৃহীত
রাতের দিকে ট্রাক যখন ঢাকার যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারে পৌঁছায় তখনও পটলের যাত্রা শেষ হয়নি। এখানে শুরু হয় নতুন ধাপ। শ্রমিকেরা ট্রাক থেকে সবজি নামিয়ে আড়তে নিয়ে যান। আড়তে প্রতি কেজিতে প্রায় ২ টাকা আড়তদারি খরচ যোগ হয়। সঙ্গে থাকে শ্রমিকের মজুরি, বাছাইয়ের সময় কিছু পণ্য নষ্ট হওয়ার ক্ষতি। এরপর একের পর এক হাতবদল ; আড়তদার থেকে ফড়িয়া, ফড়িয়া থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বিক্রেতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার হাতে পৌঁছানো। প্রতিটি ধাপে ৮ থেকে ১০ টাকা করে দাম বাড়তে থাকে। ফলে ৫৬ টাকার পটোল ধাপে ধাপে ৮০, ৯০ পেরিয়ে সহজেই ১০০–১১০ টাকায় পৌঁছে যায়। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা নয় আরও কিছু বাস্তবতা কাজ করে। কৃষকেরা অভিযোগ করেন, তারা ন্যায্যমূল্যে সার ও কীটনাশক পান না। উৎপাদন পর্যায়েই তাদের খরচ বেড়ে যায়।
এরপর যোগ হয় শ্রমিকের বাড়তি মজুরি, ডিজেলের উচ্চ মূল্য, প্যাকেজিং খরচ এবং কোথাও কোথাও অনিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগ। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক পরিস্থিতি যেখানে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও কিনতে হয় বেশি দামে। মাঝখানের প্রতিটি স্তর কিছু না কিছু লাভ ও খরচ যোগ করে আর সেই বোঝা গিয়ে পড়ে শেষ ক্রেতার ওপর। এই বাস্তবতায় সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, সরাসরি কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই দামের ব্যবধান অনেকটাই কমানো সম্ভব। মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো এবং বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের দাবি।
যশোরের মাঠ থেকে ঢাকার রান্নাঘর এই যাত্রা তাই শুধু একটি সবজির নয় বরং দেশের কৃষি অর্থনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার কাঠামোর একটি প্রতিচ্ছবি।