ডিজিটাল যুগে একটি শিশুর পরিচয় অনেক সময় জন্মের আগেই তৈরি হয়ে যায়। গর্ভাবস্থার সোনোগ্রাম, নবজাতকের প্রথম ছবি কিংবা শিশুর ছোট ছোট মুহূর্ত এসবই এখন সহজেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেক মা–বাবা সন্তানের বেড়ে ওঠার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এসব শেয়ার করেন। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা জটিলতা ও ঝুঁকি যা অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়।
বর্তমানে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানকে নিয়ে নিয়মিত অনলাইনে পোস্ট করেন। এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘শেয়ারেন্টিং’ অর্থাৎ সন্তানকে নিয়ে অতিরিক্ত শেয়ার করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেক শিশুর অনলাইন পরিচয় জন্মের আগেই তৈরি হয়ে যায়। ফলে শিশুটি বড় হওয়ার আগেই তার ব্যক্তিগত জীবনের বহু তথ্য ইন্টারনেটে স্থায়ীভাবে থেকে যায়।
সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তার কারণে এখন অনেক শিশু হয়ে উঠছে অনলাইন তারকা। তাদের বলা হয় ‘কিডফ্লুয়েন্সার’। শিশুর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড খেলাধুলা, স্কুলের গল্প কিংবা পারিবারিক মুহূর্ত সবকিছুই ভিডিও বা ছবির মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখন বহু বিলিয়ন ডলারের একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। জনপ্রিয় অ্যাকাউন্টগুলো একটি স্পন্সরড পোস্ট থেকেই বিপুল অর্থ আয় করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বছরে মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উপার্জনও হচ্ছে। কিন্তু এই আয় ও জনপ্রিয়তার আড়ালে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই খাতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো আইনগত সুরক্ষার অভাব। অনেক দেশে শিশুদের দিয়ে তৈরি অনলাইন কনটেন্টের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। ফলে শিশুর আয়ের একটি অংশ সংরক্ষণ করা কিংবা তাদের সম্মতির বিষয়টি প্রায়ই অবহেলিত থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সব সিদ্ধান্তই অভিভাবকদের হাতে থাকে।
অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের এই খ্যাতি ও অর্থ তাদের ভবিষ্যতে সুযোগও এনে দিয়েছে। খেলনা রিভিউ করা একাধিক শিশু ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাদের ভিডিও থেকে বড় অঙ্কের আয়ও হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার এটিকে সম্ভাবনাময় একটি পেশা হিসেবেও দেখতে শুরু করেছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই জনপ্রিয়তার জন্য অনেক সময় শিশুদের ব্যক্তিগত মুহূর্তও প্রকাশ্যে চলে আসে। অসুস্থতা, কষ্ট বা বিব্রতকর পরিস্থিতির ভিডিওও দর্শকের আকর্ষণের জন্য প্রকাশ করা হচ্ছে যা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব কি সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি দর্শক বাড়ানোর জন্য কনটেন্ট তৈরি করা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হচ্ছে। গর্ভাবস্থা, নবজাতক বা বড় পরিবারের কনটেন্ট দর্শকদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হওয়ায় এটি একটি লাভজনক বাজারে পরিণত হয়েছে।
শৈশবে পারিবারিক ভ্লগে অংশ নেওয়া অনেকেই বড় হয়ে এসে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তারা মনে করেন, ছোটবেলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন অনুমতি ছাড়াই বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। এতে তাদের মানসিক চাপ ও ব্যক্তিগত অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।
এই ধরনের ঘটনার পর কিছু অঞ্চলে শিশু ইনফ্লুয়েন্সারদের সুরক্ষায় নতুন আইন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেটের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো অনলাইন শিকারি বা প্রিডেটরদের উপস্থিতি। শিশুদের ছবি বা ভিডিও অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অপব্যবহার করা হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জনপ্রিয় শিশু ইনফ্লুয়েন্সারদের বাস্তব জীবনেও অনুসরণ করার ঘটনা ঘটেছে।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, সামাজিক মাধ্যমে শিশুকে নিয়ে পোস্ট করা একেবারে নিষিদ্ধ নয়। তবে এর আগে অভিভাবকদের ভেবে দেখা প্রয়োজন এই পোস্ট কি শিশুর ভবিষ্যৎ, গোপনীয়তা বা নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে কি না।
একটি নিরীহ বা ‘কিউট’ ছবি হয়তো মুহূর্তে অনেক লাইক পেতে পারে কিন্তু সেই ছবি ইন্টারনেটে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারে। তাই সন্তানের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সর্বাগ্রে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে দায়িত্বশীল আচরণ।
* দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে