ঈদযাত্রআসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এবার বড় ধরনের সড়ক বা রেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশপথে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হবে।
এছাড়া ঈদযাত্রায় সম্ভাব্য যানজট ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৫৫টি পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে এবং প্রয়োজন হলে ড্রোনের মাধ্যমে সড়ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

এবারের ঈদযাত্রায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৫৫টি স্পটে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে -ফাইল ফটো
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে ঈদযাত্রা ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখা, যানজট কমানো, দুর্ঘটনা মোকাবিলা, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক ও রেলপথে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা সম্ভব হয় না। সেই সমস্যা সমাধানে এবার আকাশপথ ব্যবহার করে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাসড়ক বা রেলপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেলিকপ্টার ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করবে। এর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, রেসকিউ বোট, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হবে।
প্রয়োজনে কোস্টগার্ডের সহায়তাও নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশের ট্রমা সেন্টার ও হাসপাতালগুলোকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঈদকে ঘিরে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকে সীমান্ত নিরাপত্তাও জোরদার করা হচ্ছে। এ জন্য বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে নিয়মিত টহল বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঈদের সময় দীর্ঘ যানজট কমাতে এবার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৫৫টি স্থানে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করে যানবাহনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এছাড়া পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু এবং অন্যান্য যানজটপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত রেকার প্রস্তুত রাখা হবে, যাতে কোনো যানবাহন বিকল হলে দ্রুত তা সরিয়ে নেওয়া যায়।
ঈদযাত্রায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে কঠোর নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার বেশি অর্থ আদায় করতে পারবে না। টার্মিনাল ও স্টেশনগুলোতে বিশেষ মনিটরিং টিম মোতায়েন করা হবে।
ঈদের সময় প্রতারণা ও ‘অজ্ঞান পার্টি’র ঘটনা এড়াতে যাত্রীদের সচেতন করতে বিশেষ প্রচারণা চালানো হবে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে মাইকিংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষকে অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হবে।
ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। এ সময় বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি বাড়ে। তাই পাড়া-মহল্লায় পুলিশের টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কূটনৈতিক এলাকাগুলোতেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।
ঈদের কেনাকাটা উপলক্ষে শপিং মল ও মার্কেট এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন থাকবে। নারী ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী পুলিশের উপস্থিতিও বাড়ানো হবে।
ঈদের আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস সময়মতো পরিশোধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মার্চ মাসের বেতন এবং ঈদ বোনাস অবশ্যই ছুটির আগে পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়টি তদারকিতে শিল্প পুলিশ মালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে।
ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করবে। এসব কন্ট্রোল রুম জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাজী শরীফ উদ্দিন মনে করেন, দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রথম কয়েক ঘণ্টা উদ্ধার তৎপরতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই হেলিকপ্টারসহ জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঈদের সময় মানুষের অতিরিক্ত যাতায়াতের সুযোগে নানা ধরনের অপরাধ বাড়তে পারে। তাই টার্মিনাল, স্টেশন ও জনাকীর্ণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা, সাদা পোশাকের পুলিশ এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের সময় লাখো মানুষ রাজধানী ও বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যান। এই বিশাল যাত্রাপথকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সবাই যেন নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারেন।