ভিআইপি ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত দেহরক্ষীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ ওঠার পর ইতোমধ্যে অন্তত ১২ জন দেহরক্ষীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ৩০ জনের বিষয়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের নিরাপত্তায় বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে মোট ১১১ জন পুলিশ সদস্যকে দেহরক্ষী বা গানম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরে অভিযোগ ওঠে, তাদের একটি বড় অংশই আ.লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক সুপারিশে বা ছাত্রলীগ কোটায় পুলিশে নিয়োগ পান। তারা তখনকার মন্ত্রীদের নিরাপত্তায়ও দায়িত্ব পালন করেন।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কোনো সদস্যকে ভিআইপি নিরাপত্তায় রাখা হবে না। কিন্তু পরে বিভিন্ন তদবির, সুপারিশ এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে বিতর্কিত কয়েকজনকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, দায়িত্ব পালনের সময় কিছু দেহরক্ষীর রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ ধরনের স্পর্শকাতর দায়িত্বে রাখলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তালিকায় নাম থাকা কনস্টেবল কাউছার আহমেদ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুর দেহরক্ষী ছিলেন। পরে তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের দেহরক্ষী ছিলেন। তিনিই পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের গানম্যান নিয়োগ পেয়েছেন।
তালিকায় নাম থাকা কনস্টেবল মো. তাসনীম আলম সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারের এবং পরে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের দেহরক্ষী ছিলেন। বর্তমান সরকারের সময়েও তাকে আবার একই দায়িত্বে রাখা হয়।
কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের গানম্যান ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নিরাপত্তায় যুক্ত হন। পরে তাঁকে বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর গানম্যান করা হয়।
এএসআই বশির উল্লাহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. শহীদুজ্জামান সরকারের গানম্যান ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের নিরাপত্তায় যুক্ত হন। বর্তমান ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর দেহরক্ষী হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিনের দেহরক্ষী ছিলেন। তাঁকে বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের দেহরক্ষী নিযুক্ত করা হয়।
এএসআই আব্দুর রহমান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের দেহরক্ষী ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমানের দেহরক্ষী ছিলেন। নতুন সরকার আসার পর তাকে নৌপরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করা হয়।
কনস্টেবল রাসেদুল হক সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর দেহরক্ষী ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর নিরাপত্তায়ও ছিলেন। বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের দেহরক্ষীও নিযুক্ত হন তিনি।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালন করা কনস্টেবল মিলন মাতব্বরকে নিয়োগ করা হয় বর্তমান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের নিরাপত্তায়।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঁঙ্গা, কে এম খালিদ মাহমুদ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দেহরক্ষী ছিলেন এএসআই কামরুজ্জামান। বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর দেহরক্ষীও করা হয় তাকে।
এসবিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার পর অন্তত ১২ জন ভিআইপির দেহরক্ষীকে পরিবর্তন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী; সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী; তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী; স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের দেহরক্ষী রয়েছেন।
এসবির অতিরিক্ত আইজিপি সরদার নুরুল আমিন বলেন, গানম্যান বা দেহরক্ষী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভেটিং করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অনেককে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ যদি নিরপেক্ষ ও পেশাদার হয়, তাহলে এ ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু নিয়োগ দলীয় বিবেচনায় হয়ে থাকলে নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিষয়টি নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ ছিল না। দেশের পুলিশ বাহিনী এখনো এতটা পেশাদার হয়ে ওঠেনি যে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মতাদর্শ পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
এদিকে পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেহরক্ষী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভেটিং প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। অভিযোগের পর কয়েকজনকে ইতোমধ্যে বদলি করা হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়োগে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না করা গেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।