ডিজেল আর বিদ্যুতের সংকটে যখন কৃষকের সেচব্যবস্থা হুমকির মুখে তখন ঠাকুরগাঁওয়ের এক স্বশিক্ষিত উদ্ভাবকের হাত ধরে এসেছে আশার আলো। সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি ‘ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র’ এখন হয়ে উঠেছে কৃষকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামের মাঠে এখন আর ডিজেল পাম্পের শব্দ নেই, নেই কালো ধোঁয়ার দূষণ। প্রখর রোদই সেখানে আশীর্বাদ কারণ সূর্যের আলো পড়লেই সচল হয়ে ওঠে সোলেমান আলীর তৈরি সেচযন্ত্র, আর মাটির নিচ থেকে উঠে আসে পানির ধারা।
অভাবের কারণে প্রথম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি সোলেমান। কিন্তু অভিজ্ঞতা আর উদ্ভাবনী চিন্তা দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ২ হাজার ৫০০ ওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরচালিত পাম্প। সূর্যের আলো পেলেই এটি ৩ হর্সপাওয়ারের মোটর চালিয়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ৭০০ লিটার পানি তুলতে পারে।
এই প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছেন শত শত কৃষক। আগে যেখানে ডিজেল কিনতে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এখন দিনের আলোতেই সেচের কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে খরচও কমেছে অনেক। বিদ্যুতের জন্য রাত জেগে অপেক্ষার দিনও প্রায় শেষ।
বর্তমানে সোলেমানের কাছে রয়েছে ২৬টি সৌর পাম্প। এর মধ্যে ৬টি নিজে পরিচালনা করেন, আর ২০টি মৌসুমভিত্তিক ভাড়ায় দেন কৃষকদের কাছে। প্রতিটি পাম্প মৌসুমে ৩৬ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়ে তিনি নিজেও হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা। গত বছর আয় করেছেন প্রায় ৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা, আর চলতি মৌসুমে তা ৮ লাখ ছাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, তার এই উদ্যোগ এখন প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দিচ্ছে যা স্থানীয় কৃষিতে এনেছে নতুন গতি।
সোলেমান আলীর স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান সরকারি সহায়তা পেলে এই প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে। তার ভাষায়, প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকের কষ্ট কমানোই আমার লক্ষ্য।
কৃষি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এই উদ্ভাবন শুধু একটি যন্ত্র নয় বরং বর্তমান জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে কমবে জ্বালানি নির্ভরতা, বাড়বে কৃষি উৎপাদন।
উত্তরের মাঠে তাই এখন সূর্যের আলো মানেই শুধু গরম নয় এটি কৃষকের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।