মোসাম্মৎ কোহিনূর বেগম। জন্ম থেকেই তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী। প্রতিবন্ধী এবং অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তান বলে ভিক্ষা করে চেয়েচিন্তে খেয়ে রাস্তাঘাটেই বেড়ে উঠেন তিনি।শুরু থেকেই রাজধানীর ধানমন্ডি লেকপাড় তার বিচরণ ক্ষেত্র। সকালেবিকেলে লেকপাড়ে হাটতে আসা মানুষজন সহ এলাকাবাসীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে ‘কোহিনূর’ হচ্ছে একটি চেনামুখের নাম। এমনি অবস্থায় একসময় তিনি সংসার বাঁধেন । দুটি কন্যাসন্তান হয় তার। আজ থেকে ২১ বছর আগে তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন। বাবামাকে হারিয়েছেন আরও অনেক আগে। ভিক্ষাবৃত্তি করে দুই মেয়েকে বড় করে পরের ঘরে তুলে দিয়ে কোহিনূর আজ একা। ভিক্ষা করে জীবনের এতগুলো বছর পাড় করার পর হঠাৎ তার মাথায় নতুন চিন্তার উদয় হলো। সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আর ভিক্ষা করবেন না। কর্ম করে খাবেন।
কিছুদিন আগে ভিক্ষাবৃত্তির গন্ডি পেরিয়ে ধানমন্ডি লেকের ৮ নং ব্রিজের গোড়ায় বসে মেহেদী বেটে বিক্রি করতে শুরু করেন কোহিনূর। ভিক্ষাজীবি নারী কোহিনূরের এই বদলে যাওয়ার দৃশ্য অনেকেরেই নজরকাড়ে । কোহিনূরকে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করতে অনেকেই তার প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন।
ধানমন্ডি লেকপাড়ে হাটার সংগঠণ ‘সুস্থ্যজীবন’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এবং একটি বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা এসডিআই এর নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট সমাজ সেবক সামছুল হক ভিক্ষারীনি কোহিনূরের এই পরিবর্তন দেখে একদিকে বিস্মিত, অন্যদিকে মুগ্ধ হন। তিনি তার হাঁটার সাথীদের সাথে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেন। ভিক্ষুক কোহিনূরকে একজন উদ্যোক্তা বানাতে তারা কহিনূরের প্রচারনার জন্য তাকে সাইনবোর্ড, মেহেদী পাতা কেনার জন্য মূলধন, লেবেল যুক্ত প্লাষ্টিকের কাপ, শীলপাটা, পরিমাপের জন্য ডিজিটাল স্কেল সহ নানা কিছু দিয়ে সাহায্য করেন। শুধু সহযোগিতা নয়, নিয়মিত তারা কোহিনূরের খোঁজখবর নেন।
কোহিনূর জানান, ভিক্ষা করে জীবনের অনেক সময় পার করেছেন। এখন আর তিনি ভিক্ষা করতে নারাজ। তিনি কর্ম করে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও সংগঠণের সভাপতি সামছুল হক বলেন, কোহিনূরের যে স্বদিচ্ছা, উদ্দ্যোগ তা তার জীবনে সম্মান ও মর্যাদা এনে দিয়েছে। তার যে পরিবর্তন সেটা আমাদের সমাজে অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা ও উজ্জল একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে।
তারা ছাড়াও আরও অনেকেই তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। কোহিনূর এখন শুধু মেহেদী বিক্রি করেন না। কাঁচা হলুদ, আমলকী, এ্যালুভেরা, লেবুসহ আরও কিছু প্রাকৃতিক ভেষজ দ্রব্য বিক্রি করেন। তার দোকানে এখন সবসময় লেগে থাকে ক্রেতাদের ভীড়। বেচাবিক্রি বেশ ভাল। অভিজাত শ্রেণির নারীপুরষরাও এখন কোহিনূর মেহেদী পয়েন্টের কাষ্টমার। তাদের মতে কোহিনূরের মেহেদী ও অন্যান্য দ্রব্যগুলো নির্ভেজাল ও কেমিক্যালমুক্ত।
এখনও অনেকেই কোহিনূরকে ভিক্ষা দিতে আসে। কিন্তু কোহিনূর ভিক্ষার অর্থ গ্রহন না করে হাসি মুখে জানিয়ে দেন তিনি আর এখন ভিক্ষার অর্থ গ্রহণ করেন না। তিনি এখন কর্মকরে খান। ভিক্ষাবৃত্তির সীমানা পেরিয়ে প্রতিবন্ধী নারী কোহিনুর এখন উদ্যোক্তা।
কোহিনূরের এই পরিবর্তনের ঘটনা লেকপাড়ে বেশ সাড়া ফেলেছে। হাতেবাটা, কেমিকেলমুক্ত, নির্ভেজাল মেহেদীর জন্য মেহেদী ব্যবহার কারীরা চলে আসছেন ধানমন্ডি লেকপাড়ে ৮ নং ব্রিজের গোড়ায় কোহিনূর মেহেদী পয়েন্টে।