জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জোটের একাধিক শরিক অভিযোগ করছে, জামায়াত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে সবাইকে সঙ্গে রাখলেও নির্বাচনী কৌশলে ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে।
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের সব সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। অনেক প্রার্থী ইতোমধ্যে মাঠে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগস্টে ইউনিয়ন পরিষদের তপশিল ঘোষণা হতে পারে এবং অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে শরিক দলগুলোর দাবি, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও সমন্বিত জোটগত কৌশল থাকা উচিত। কিন্তু জামায়াত প্রায় সব জায়গায় একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ায় তারা নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছে। বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেছেন, ১১ দলীয় ঐক্য জুলাই সনদের পক্ষে সক্রিয় থাকলেও নির্বাচনী সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
জোটে অসন্তোষের আরেকটি কারণ হলো গুরুত্ব বণ্টনের প্রশ্ন। শরিকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ খেলাফত ও এনসিপি ছাড়া অন্য দলগুলোকে জোটের কর্মসূচিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সমাবেশে সভাপতিত্ব বা প্রধান অতিথির দায়িত্বও মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক সময় শরিক দলগুলোর দ্বিতীয় সারির নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও মেলে না।
ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ সংসদে আসন না পাওয়া খেলাফত আন্দোলন জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। খেলাফত মজলিসও সাম্প্রতিক সময়ে জোটের কর্মসূচিতে অনুপস্থিত রয়েছে। দলটির মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের জানিয়েছেন, তারা আপাতত জোটের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না যদিও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রয়েছেন।
অন্যদিকে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও জোটের অতিসক্রিয়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট। এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য বাদানুবাদও সম্পর্কের টানাপোড়েনকে সামনে এনেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরোধও রাজনৈতিক দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তবে জোটের সব দল সমানভাবে আপত্তি তুলছে না। এলডিপি, নেজামে ইসলাম, জাগপা, বিডিপি ও লেবার পার্টি জামায়াতের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন বিরোধিতা করেনি। এসব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্বও নেই।
হেফাজতে ইসলামকে ঘিরেও নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। কওমি ধারার কয়েকটি দল একই সঙ্গে হেফাজত ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আলেম সমাজে আদর্শিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ মনে করে, জামায়াতের মওদুদীবাদী চিন্তাধারা কওমি মাদ্রাসায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জামায়াত অবশ্য এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছে। দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, হেফাজতের অবস্থানের পেছনে বিএনপির প্রভাব রয়েছে এবং কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াতের জোট থেকে বের করে নেওয়ার একটি রাজনৈতিক চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে এনসিপিও একক প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি কয়েকটি সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এবং শতাধিক উপজেলা ও পৌরসভায় সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা করেছে। তবু তারা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয়ের সম্ভাবনা খোলা রাখতে চায়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ঘিরে জোটের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে প্রতিযোগিতা। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সেখানে নির্বাচন করতে আগ্রহী। অন্যদিকে জামায়াত গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে জামায়াত আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে। তার মতে, জাতীয় নির্বাচনে জোট কার্যকর হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় বাস্তবতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজন হলে জেলা বা মহানগর পর্যায়ে শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে যে রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে তা কেবল মান-অভিমানের সীমায় আটকে নেই। শরিকদের প্রশ্ন এখন একটাই আন্দোলনে একসঙ্গে থাকলে নির্বাচনে কেন আলাদা পথ?