তিস্তার পানি কখনও বাড়ছে, আবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কমে যাচ্ছে। নদীর এমন অস্বাভাবিক ওঠানামার মধ্যে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিনটি গ্রাম। নদীর তীব্র স্রোতে নবনির্মিত তীর সংরক্ষণ বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কয়েকটি বসতঘর ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি লোকালয়ে পানি ঢুকে প্রায় এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটছে প্রায় দেড় হাজার পরিবারের।
বুধবার (১৫ জুলাই) সরেজমিনে গঙ্গাচড়া উপজেলার তালপট্টি-নরশিং এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক মাস আগে প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বাঁধ নির্মাণের পর তিস্তার ভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়ার আশা করেছিলেন এলাকার মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও তীব্র স্রোতে সেই আশায় ভাটা পড়েছে। বাঁধের একটি বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় আবারও আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি দ্রুত ওঠানামা করছে। সপ্তাহখানেক আগে বাঁধে প্রথম ভাঙন দেখা দিলেও গত সোমবার রাতে দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। প্রবল স্রোতে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রায় ২০০ মিটার অংশ নদীতে ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে নদীতীরজুড়ে ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ভাঙনের কারণে পশ্চিম হরিণচড়া, তালপট্টিসহ আশপাশের তিন গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বসতভিটা ছাড়াও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, আমন ধানের বীজতলা, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কও হুমকির মুখে পড়েছে।
পশ্চিম হরিণচড়া গ্রামের আব্দুল কাদের বলেন, “বাঁধ হইতে না হইতেই কয় মাসের মাথায় সেটাও নদীত চলি গেইল। এইবার হামারগুলার মরণ ছাড়া কোনো উপায় নাই।”
তালপট্টি এলাকার রুকনুজ্জামান বলেন, “বাঁধ দেওয়ার পর ভিটায় টিকি থাকার স্বপ্ন দেকচেনো। সেই বাঁধও ভাঙ্গি গেইল। এ্যালা এ্যাটে থাকি চলি যাওয়া ছাড়া হামার আর কোনো পথ নাই।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পরপরই যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো তীর সংরক্ষণ বাঁধের এত বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরেই ভাঙন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত এলাকায় ছয় হাজার জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষা কাজ চলছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও জিও ব্যাগ ফেলা হবে এবং অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নদীর পানি ওঠানামা অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ছে। যে কোনো সময় নতুন করে ভাঙন দেখা দিলে শত শত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে মানবিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তারা দ্রুত স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।