রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং পদ্ধতিগত অপরাধ এমন মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হেফাজতে ইসলামকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ওই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল।
রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একটি ‘পদ্ধতিগত অপরাধ’ এবং এতে ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের দায়বদ্ধতার বিষয় রয়েছে। তার ভাষ্য, যখন হেফাজতের নেতাকর্মীরা ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন তখনই রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে সংগঠনটিকে দমন নয় বরং নিঃশেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড। একেবারে পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্তের খসড়া তালিকায় এখন পর্যন্ত ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, আর বাকি তিনজনের পরিচয় নিশ্চিতের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, আমাদের তালিকায় ৬১ জনের নাম রয়েছে। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও তথ্য যুক্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা দীর্ঘদিন তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এখন সেটি পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা চাই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিচার হোক এবং প্রকৃত দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হোক।
আসামিদের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, খসড়া প্রতিবেদনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন পুলিশপ্রধান, বিজিবিপ্রধানসহ আরও কয়েকজনের নাম প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত নয় তাই পূর্ণ আসামির তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে আসামিদের তালিকায় সংযোজন বা বিয়োজন হতে পারে।
সকালে হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে যায়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন আল্লামা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তারা খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে হেফাজত নেতাদের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বৈঠক শেষে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, শুরু থেকেই তারা দাবি করে আসছেন যে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে মরদেহ গুম করার চেষ্টা হয়েছিল, ফলে অনেক তথ্য এখনো তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে সংরক্ষিত প্রামাণ্য তথ্য অনুযায়ী ৬১ জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত।
একই দিন সকালে তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনের কাছে যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছেন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা, লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর, তৎকালীন আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, তদন্তের চূড়ান্ত পর্যালোচনা শেষে আগামী ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিলের আশা করা হচ্ছে।